রবিবার, ২৬ জুন ২০২২, ০৫:২৫ অপরাহ্ন

আমার পরিচয় হিরোইন অব সত্যজিৎ রায়

বিনোদন ডেস্ক:
  • আপডেট সময় শনিবার, ২ মে, ২০২০
  • ১০৩

সত্যজিৎ রায়। এক বিস্ময়ের নাম। নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার, শিল্পনির্দেশক, সংগীত পরিচালক, লেখক- এমন অনেক পরিচয় যুক্ত হয়েছে তার জীবনে। অনবদ্য সৃষ্টি তাকে এনে দিয়েছে অমরত্ব।  আজ এই নির্মাতার ৯৯তম জন্মবার্ষিকী। গুণী এই নির্মাতার স্মরণ করে তাকে নিয়ে বলেছেন বাংলাদেশের এক সময়ের সাড়া জাগানো জনপ্রিয় অভিনেত্রী ববিতা

সত্যজিৎ রায় কত বড়মাপের নির্মাতা, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। অনবদ্য সৃষ্টি তাকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায়। ভাবতে ভালো লাগে, তার পরিচালনায় ‘অশনি সংকেত’ ছবিতে আমি অভিনয় করেছি। তাকে দেখেছি, যখন যে কাজ করতেন, পুরোপুরি তার মধ্যে ডুবে যেতেন। তার ছবিতে কাজের সুবাদে অনেক গুণী মানুষের দেখা পেয়েছি। এত গুণী মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম বলেই আজ আমি এই অবস্থানে আসতে পেরেছি। ‘অশনি সংকেত’ ছবিতে যখন অভিনয় করি তখন সত্যজিৎ রায়কে এভাবে চিনতাম না। পরে তার সম্পর্কে জানাশোনা হয়েছে। তার ব্যক্তিত্ব যেমন মুগ্ধ করেছিল, তেমনি কিছুটা ভয়ও পাইয়ে দিয়েছিল। এত বড়মাপের মানুষের কাছাকাছি থাকতে একটু হলেও নার্ভাস লাগত। এখনও চোখে ভাসে সত্তর দশকের শুরুর সেই দিনগুলোর কথা। ১৯৭২ সালের ঘটনা। ‘অশনি সংকেত’ নামে একটি যুদ্ধবিরোধী ছবি বানানোর কাজ হাতে নিলেন সত্যজিৎ রায়। সেই সিনেমার জন্য নায়িকা খুঁজছিলেন তিনি। তার ক্যামেরাম্যান নিমাই ঘোষ ঢাকায় এসে আমার ২শ ছবি তুলে নিয়ে গেলেন। তখন আমার বয়স ১৬ বছর। এরপর অপেক্ষা। ডাক আর আছে না।

কিছুদিন পর প্রাথমিক মনোনয়নের খবর জানিয়ে ভারতীয় হাইকমিশন থেকে চিঠি এলো। বড়বোন সুচন্দাকে সঙ্গে করে ভারতে গেলাম সত্যজিতের সঙ্গে দেখা করতে। আমাকে ইন্দ্রপুরের স্টুডিওতে আসতে বললেন। স্টুডিওতে নানা প্রশ্ন করলেন তিনি। এরপর তিনি চিৎকার করে উঠলেন, ‘আমি অনঙ্গ বৌ পেয়ে গেছি’। এক সময় স্ট্ক্রিপ্ট হাতে পাই। তারপর ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর আগে সিঁথিতে সিঁদুর দেওয়া হয়। সাধারণ একটি শাড়ি পরে ক্যামেরার সামনে দাঁড়াই। সত্যজিৎ রায় বলেন, ‘মেয়েটি তো দারুণ ফটোজেনিক’। এরপর বাকি ইতিহাস তো সবারই কমবেশি জানা। সিনেমা মুক্তি পেল। আমার পরিচিত হলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে।

প্রখ্যাত অভিনেত্রী শাবানা আজমিকে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন- আপনার জীবনের সেরা ঘটনা কোনটি। উত্তরে তিনি বলেন, সত্যজিৎ রায়ের ছবি ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ী’তে অভিনয়। আমিও তার সুরে সুর মিলিয়ে বলতে চাই আমার জীবনের সেরা ঘটনা সত্যজিৎ রায়ের মতো একজন বিশ্ববিখ্যাত নির্মাতার ছবিতে অভিনয়। তার ছবিতে মূল চরিত্রে অভিনয় আমার জন্য বড় পাওয়া। ছবিতে কাজ করতে গিয়ে দেখিছি সাধারণ বিষয়কে তিনি অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলতেন। তিনি কখনও রোদে শুটিং করতেন না। সেটগুলো এমনভাবে সাজাতেন যেন সবকিছু জীবন্ত। গ্রামের ধানক্ষেত, চালের ওপর লাউ, পাখির খাঁচা একেবারে অন্যরকমভাবে ফুটিয়ে তুলতেন পর্দায়। কেউ কিছু না পারলে শান্তভাবে বলতেন, ‘তোমার কাজ ভালো হয়েছে, তবে আমি আবার শট নিতে চাই’। নিজেই ক্যামেরা চালাতেন এবং স্ট্ক্রিপ্টের ডান পাশে শটের ছবি এঁকে রাখতেন। তার অমর সৃষ্টি ‘পথের পাঁচালি’, ‘অপুর সংসার’, ‘অপরাজিত’, ‘চারুলতা’ যে কতবার দেখছি তার ইয়ত্তা নেই। যতবার ছবিগুলো দেখি ততবারই মুগ্ধ হই। তিনি ছিলেন অভিভাবকতুল্য।

তার সঙ্গে রয়েছে আমার অনেক স্মৃতি। একটি কথা প্রায়ই মনে পড়ে। বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে যাওয়ার জন্য রওনা হয়েছি। সেখানকার বিমানবন্দরে কলকাতার থেকে আসা আমাদের টিমের সবার পাসপোর্ট ওকে করা হয়। বাংলাদেশি হওয়ায় পাসপোর্ট দেখে কর্তৃপক্ষ আমাকে আটকে দিয়েছিল। উৎসবে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশ থেকে এসে ফিরে যেতে হবে ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল। এটা জানার পর সত্যজিৎ রায় সেখানকার কর্তৃপক্ষকে ফোন করে আমার যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। বার্লিন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ সিনেমা হিসেবে ‘গোল্ডেন বেয়ার’ লাভ করে ‘অশনি সংকেত’। এই সিনেমার জন্য বেশ কয়েকটি পুরস্কার জিতেছি। তখন যেখানেই গিয়েছি সেখানে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় ‘হিরোইন অব সত্যজিৎ রায়’ হিসেবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো আমার সম্পর্কে সত্যজিতের একটি উক্তি।

ছবিটিতে আমার অভিনয় দেখে তিনি ভালো অভিনেত্রীর খেতাব দিয়েছিলেন। এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে। আমাকে বলা হতো ডার্লিং অব দ্য ফেস্টিভাল। ফেস্টিভালের ওপেনিং ও ক্লোজিং করানো হতো আমাকে দিয়ে। তাসখন্দ, মস্কোতে দশ-বারো বার গেছি। কলকাতার টেলি-সিনে অ্যাওয়ার্ডের ১৭তম আসরে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছি এ ছবির জন্য। কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস থেকে নির্মিত ‘অশনি সংকেত’ ছবিটি মুক্তি পায় ১৯৭৩ সালের ১৫ আগস্ট। ইতোমধ্যে ছবিটি মুক্তির ৪৬ বছর পূর্ণ হয়েছে। এখনও তার অমর সৃষ্টি সমুজ্জ্বল। কিংবদন্তি এই নির্মাতার জন্য রইল অনেক অনেক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

শেয়ার করুন

আরো খবর