বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২, ০৬:৪৪ অপরাহ্ন

করোনায় যেভাবে ময়নাতদন্ত

জাকিয়া সুলতানা (ইভা):
  • আপডেট সময় বুধবার, ৬ মে, ২০২০
  • ৩০৩

মর্গে মরদেহ আসলে ফ্যান এসি বন্ধ করে দেয়া হয়। মরদেহের মুখ ও নাক কাপড় দিয়ে ঢাকা হয়। আধাঘণ্টা পর সেই কাপড় সরিয়ে স্যাভলন, ব্লিচিং পাউডার ও ডিটারজেন্ট পাউডার মিশ্রিত গরম পানি মরদেহের নাক মুখে ঢালা হয়। এর দুই ঘণ্টা পর শুরু হয় ময়নাতদন্তের কাজ। করোনা ঝুঁকি এড়াতে মর্গের ডোমরা এভাবে্ই কাজগুলো করে থাকেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তাই ভালো নেই বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের ডোমরা। নিম্নমানের সুরক্ষা সামগ্রী দিয়ে তারা ঝুঁকি নিয়ে লাশ কাটা ঘরে কাজ করছেন। তাদের জন্য বরাদ্দ নেই পর্যাপ্ত সুরক্ষা সামগ্রী।

একবার ব্যবহারযোগ্য পিপিই তারা পরিষ্কার করে বারবার ব্যবহার করছেন। করোনা পরিস্থিতিতে ময়নাতদন্তের সংখ্যা কম হলেও যে কয়টি হচ্ছে সেগুলো করোনা ঝুঁকি নিয়েই ডোমরা সম্পন্ন করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীর তিনটি হাসপাতালে ময়নাতদন্ত করা হয়। আগে শুধুমাত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত হলেও এখন যোগ হয়েছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (মিটফোর্ড)। এদের মধ্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে সবচেয়ে বেশি দিনে গড়ে ৭-৮টি ময়নাতদন্ত হয়। এই মর্গে স্টাফদের সংখ্যাও বেশি। স্বাভাবিক সময়ে ঢাকার অন্য দু’টি মর্গেও গড়ে ৩-৪টি ময়নাতদন্ত হয়। অথচ মেডিকেল কর্তৃপক্ষ মর্গের স্টাফদের মানসম্পন্ন সুরক্ষা সামগ্রীর ব্যবস্থা করছে না।

ফরেনসিক সূত্র জানিয়েছে, কোন লাশে কি ধরনের জীবাণু আছে সেটি বোঝা যায় না। আর ময়নাতদন্তের সময় লাশের ফুসফুস ও শ্বাসনালী নিয়েই কাজ করতে হয়। করোনা ভাইরাস শরীরের এই দু’টি অংশেই থাকে। তাই ময়নাতদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ভালো মানের পিপিই, মাস্ক ও গ্লাবস ব্যবহার করা জরুরি। যদিও চিকিৎসকরা বলছেন, ৩-৪ ঘণ্টা পর মৃতদেহে করোনা ভাইরাস থাকে না। তবুও লাশ কাটার সময় সতর্কতার বিকল্প নেই।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ সহকারি যতন মানবজমিনকে বলেন, প্রতিদিনই আমাদের মর্গে মরদেহ আসছে। কোন মরদেহে করোনা ভাইরাস আছে, সেটি আমরা জানিনা না। তাই নিরাপত্তার কথা ভেবে সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহার করে ময়নাতদন্ত করি। চিকিৎসকরা আমাদের জানিয়েছেন, মৃত্যুর ৩-৪ ঘণ্টা পর মরদেহে কোনো ভাইরাস থাকে না। স্পট থেকে একটা মরদেহ মর্গে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। মরদেহে জীবাণু থাকলেও এ সময়ের মধ্যে সেটি ধ্বংস হয়ে যায়। এরপরও মরদেহ আসার সঙ্গে সঙ্গে আমরা মরদেহের মুখে কাপড় বেঁধে আধাঘণ্টা রেখে দিই। আধাঘণ্টা পরে কাপড় খুলে স্যাভলন, ব্লিচিং পাউডার ও ডিটারজেন্ট পাউডার মিশ্রিত গরম পানি মরদেহের মুখসহ পুরো শরীরে ঢেলে দেই। দুই ঘণ্টা পর ওই পানি ফুসফুসে ঢেলে দেই। তারপর আমরা ময়নাতদন্তের কাজ শুরু করি। তখন আর মরদেহে কোনো ভাইরাস থাকে না।

তিনি বলেন, হাসপাতাল থেকে আমাদের যে পিপিই দেয়া হয়েছে কাজ শেষে আমরা সেটি স্যাভলন দিয়ে ধুয়ে পরে আবার ব্যবহার করি। আর অন্যান্য সুরক্ষা সামগ্রী একবার ব্যবহার করে ফেলে দেই। তবে অন্যান্য সময়ের তুলনায় ময়নাতদন্তের চাপ অনেক কমে গেছে। পুলিশ কেসের বডি খুব কম আসতেছে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ সহকারি সেকান্দার বলেন, সারাবছরই ময়নাতদন্তের কাজ করি। করোনা পরিস্থিতিতে ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছি। করোনা শুরু হওয়ার পর থেকে মরদেহ কম আসছে। যে ক’টি আসছে তাদের মধ্যে অনেকটাই পরীক্ষা ছাড়া আসে। এসব বডিতে ভাইরাস আছে কিনা সেটা আমরা জানি না। হাসপাতাল থেকে কিছু সুরক্ষা সামগ্রী দেয়া হয়েছে, সেগুলো ব্যবহার করেই কাজ করি। এছাড়া মরদেহ আসার পর মেডিসিন ব্যবহার করে জীবাণুমুক্ত করি। তিনি বলেন, হাসপাতাল থেকে অনেকটা রেইনকোর্টের আদলে পিপিই দেয়া হয়েছে আমাদের। কাজ শেষে স্যাভলন পানি দিয়ে ধুয়ে আবার কাজ করি। মর্গে স্যাভলন, ব্লিচিং পাউডার, গ্লাবসের সাপ্লাই নেই। মর্গের স্টাফদের বিশেষ গামবুট দেয়া হয়নি।

মিটফোর্ড হাসপাতালের মর্গেও একই পদ্ধতিতে ময়নাতদন্ত করা হচ্ছে। মরদেহ মর্গে আসার আগে সেটিকে জীবাণুমুক্ত করা হয়। মর্গের স্টাফদের সুরক্ষা সামগ্রী দেয়া হয়েছে। একই পিপিই ধুয়ে-মুছে তারা বারবার ব্যবহার করছেন।

শেয়ার করুন

আরো খবর