বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ০৭:২৩ পূর্বাহ্ন

ফটকাবাজিই শেয়ারবাজার অস্থিরতার অন্যতম কারণ

রিপন রুদ্র
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২২
  • ৯৪

দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ অনেকটাই কমে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেব্রুয়ারি মাসের শুরু থেকেই করোনার তৃতীয় ঢেউয়ের চূড়া অতিক্রম করেছে বাংলাদেশ। বেশকিছু দিন ধরে ১৫ শতাংশের নিচে নেমেছে শনাক্তের হার। শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে তা ন্যূনতম ১৫ দিন অব্যাহত থাকলে তৃতীয় ঢেউ শেষ হবে- এমনই বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তবে সবকিছু নির্ভর করবে টিকাদান কর্মসূচির সফলতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপর। করোনার প্রথম দুই ঢেউয়ের চেয়ে তৃতীয় ঢেউয়ে রোগী বেড়েছে দ্রুত হারে। বিশ্বব্যাপী হয়েছে শনাক্তের নতুন নতুন রেকর্ড। তবে আশাজাগানিয়া বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অ্যান্থনি ফাউসি আশা করেন, করোনা এর পর সাধারণ রোগের (এনডেমিক) স্তরে পৌঁছাতে পারে। তিনি বলেন, ওমিক্রন ধরনের মাধ্যমেই প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের মহামারী পর্ব শেষ হতে পারে। আবার উদ্বেগের বিষয় হলো, এর ঠিক উল্টোটা বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ওমিক্রনকে হালকাভাবে না দেখে ‘ভ্যারিয়েন্ট অব কনসার্ন’ হিসেবে ঘোষণা করে তারা বারবার সতর্ক করছেন। সংস্থাটির মতে, এর পর করোনার আরও নতুন ধরন আসতে পারে। তা হলে কি পৃথিবী থেকে করোনা নিশ্চিহ্ন হওয়ার আশা-দুরাশাই থেকে যাবে? আবার কি থেমে যাবে বিশ্ব অর্থনীতি? না ‘করোনার সঙ্গে বসবাস’ নীতি মেনেই চালিয়ে যেতে হবে অর্থনৈতিক কর্মকা-?

সাম্প্রতিক সময়ে অব্যাহত দরপতনের প্রেক্ষাপটে গত ১৯ ডিসেম্বর থেকে ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত টানা ১৫ কার্যদিবসে ৯৬ হাজার ১৫ বিও অ্যাকাউন্টধারী শেয়ার বিক্রি করে সেগুলো পুরোপুরি খালি করেন। অথচ বছর শেষে অনেক কোম্পানির, বিশেষ করে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা খাতে লভ্যাংশ ঘোষণার সময়। এর পর আবার গত ৯ জানুয়ারি একদিনেই ৭৬ হাজার ৭০২ অ্যাকাউন্টে ফের শেয়ার যোগ হয়। ফলে সূচকও তথাকথিত একটি মাইলফলকের আশপাশে ঘুরপাক খায়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, আমাদের দেশের বিনিয়োগকারীরা সব সময়ই একটি মাইলফলকের অপেক্ষায় থাকে। প্রশ্ন হচ্ছে, মনস্তাত্ত্বিক এই মাইলফলকের স্তরে সূচক পৌঁছাবে কীভাবে- যদি এভাবে বিনিয়োগকারীদের নিজেদের পত্রকোষের সমুদয় শেয়ার বিক্রির প্রবণতা থাকে। এ যেন মাঠে না নেমেই খেলোয়াড়দের গোল দেওয়ার ব্যর্থ প্রয়াস। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ না করে সূচক ধরে রাখা অথবা স্থিতিশীল বাজার প্রত্যাশা। আমাদের বিনিয়োগকারীরা জানেনই না, তারা (বাছবিচার ছাড়াই) কী শেয়ার বিক্রি করছেন আর কেনই বা বিক্রি করছেন। তাদের একটি আবেগপ্রবণ ধারণা হলো, এই শেয়ার তারা আরও কম দামে কিনতে পারবেন। যারা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে এই বেপরোয়া আচরণ করছেন, তাদের কি বিনিয়োগকারী বলা যায়? ফটকাবাজিরও ন্যূনতম একটা নৈতিক বোধ থাকা উচিত। তবে শেয়ারবাজারের ভাষায়- যে ব্যক্তি সিকিউরিটি কেনাবেচা করেন, তাকে আমরা বিনিয়োগকারী বলে থাকি। তিনি যা-ই কিনুন, যে উদ্দেশ্যে কিনুন, যে মূল্যে কিনুন, যত কম সময়ের জন্যই কিনুক। শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও ফটকাবাজির পার্থক্য সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগের আগে আমাদের ভেবে দেখতে হবে, আমরা নিজেদের কী হিসেবে দেখতে চাই- বিনিয়োগকারী, না ফাটকাকারবারি। আশা করি, বিনিয়োগকারীদের বোধোদয় হবে। অন্যথায় অজান্তেই ফটকাবাজিতে নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত তো করবেনই, সার্বিক বাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার এ কারণে লেনদেনেও দেখা দেয় এক প্রকার অস্থিরতা। লেনদেন কম হলে বাজার স্থবির হয়ে পড়ে। বাজার হারায় নিজস্ব স্বকিয়তা।

আমাদের শেয়ারবাজারে তারল্যের পরিমাণ সমপর্যায়ের দেশগুলোর তুলনায় অনেকটাই কম। আমাদের যেখানে গড়ে দিনে এক হাজার থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা সমমূল্যের শেয়ার হাতবদল হয়, সেখানে ভিয়েতনামে এর পরিমাণ ৬-৭ হাজার কোটি টাকা। গত পঞ্চাশ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, ওই তুলনার বিচারে আমাদের শেয়ারবাজারের এ দুরবস্থা ডিজার্ভ করে না। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই দুরবস্থা? সহজ উত্তর- সুরক্ষা নেই। যেখানে বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নেই, সেখানে তারা কেন আসবেন? তাই মূল কাজটি করতে হবে নিয়ন্ত্রক সংস্থার। আর সেটি হলো বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করা। সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তা হলে বাজারে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। এখানে আরেকটি প্রশ্ন থেকে যায়- কোন ধরনের বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে? অবশ্যই প্রশিক্ষিত, অর্থনৈতিক ন্যূনতম জ্ঞানসম্পন্ন সচেতন ব্যক্তি। বিনিয়োগকারীরা কেন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করবেন- দেশে ব্যাংকের আমানত বা অন্য বিনিয়োগের চেয়ে বেশি লভ্যাংশ বিবেচনায়। তবে সেটি প্রকৃত বিনিয়োগ হতে হবে। শেয়ারবাজারে তারল্য বাড়লে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পথ সুগম হয়। দেশ যত উন্নতির দিকে যায়, বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্তির হারও বাড়তে থাকে। ওই বিবেচনায় বাংলাদেশের শেয়ারবাজার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ থেকে লাভবান হওয়ার মতো আদর্শ অবস্থানে রয়েছে। বুঝে-শুনে ফটকাবাজি না করে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মাধ্যমে এ সুযোগটি কাজে লাগানোর এখনই সময়।

আরো পড়ুন: তরুণীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ, ছাত্রলীগ নেতা গ্রেফতার

শেয়ার করুন

আরো খবর