সোমবার, ২৭ জুন ২০২২, ১০:২৯ পূর্বাহ্ন

কাতারে বাংলাদেশিসহ অভিবাসী শ্রমিকদের মানবেতর জীবন

অনলাইন ডেস্ক:
  • আপডেট সময় শুক্রবার, ৮ মে, ২০২০
  • ২১৩

কাজ নেই। কোনো অর্থও নেই হাতে। ফুরিয়ে এসেছে খাবার। নেই বেঁচে থাকার কোনো বিকল্প উপায়। এমন অবস্থা হতাশা আর ভীতি গ্রাস করেছে কাতারে বসবাসকারী বাংলাদেশিসহ হাজার হাজার শ্রমিককে। করোনা ভাইরাস মহামারিতে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। লন্ডনের প্রভাবশালী অনলাইন গার্ডিয়ানে ‘কাতারস মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স বেগ ফর ফুড অ্যাজ কোভিড-১৯ ইনফেকশন্স রাইজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন সাংবাদিক পিটি প্যাটিসন ও রোশান সেদহাই। এতে বলা হয়, বিশে^র অন্যতম ধনী দেশ কাতার।

সেখানে করোনা ভাইরাস মহামারি ভয়াবহ আকার ধারণ করায় অর্থনীতিতে ধস নেমেছে। এর ফলে সেখানে বসবাসকারী কম বেতনের অভিবাসী শ্রমিকরা খাদ্যের জন্য অন্যের কাছে হাত পাততে বাধ্য হচ্ছেন।
২০২২ সালের বিশ^কাপ ফুটবলের আয়োজক কাতার। এ জন্য সেখানে নির্মাণকাজে যোগ দিয়েছেন বিশে^র বিভিন্ন দেশের শ্রমিক। তাদের মধ্যে কমপক্ষে ২০ জনের সাক্ষাতকার নিয়েছে গার্ডিয়ান। এ সময় ওইসব শ্রমিক ভয়াবহ হতাশা ও আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন। তাদের অনেকেই গার্ডিয়ানকে বলেছেন, আকস্মিকভাবে তারা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। টিকে থাকার জন্য উপার্জনের আর কোনো পথ খোলা নেই। অন্যরা বলেছেন, তারা বাড়ি ফিরতে মরিয়া। কিন্তু এক্ষেত্রে অক্ষম তারা। কেউ কেউ তাদের নিয়োগকর্তা বা দাতব্য সংস্থার কাছ থেকে হাত পেতে খাদ্য নিয়ে খেতে বাধ্য হচ্ছেন। এমনই একজন বাংলাদেশি পরিচ্ছন্নকর্মী রফিক। তিনি মার্চে কাজ হারিয়েছেন। রফিক বলেছেন, আমার কাছে বেশি খাবার জমা নেই। অল্প চাল আর ডাল আছে আমার। এ দিয়ে দু’একদিন চলতে পারে। যখন এই খাবার ফুরিয়ে যাবে তখন আমি কি করবো? উদাস চোখে প্রশ্ন করেন রফিক।
কাতারে বসবাস করেন কমপক্ষে ২০ লাখ অভিবাসী শ্রমিক। বর্তমানে বিশে^র মাথাপিছু সর্বোচ্চ সংক্রমণের দেশ কাতার। সেখানকার মোট জনসংখ্যা ২৮ লাখ। এরই মধ্যে সেখানে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ১৮ হাজার মানুষ। গত সপ্তাহে যাদের করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে তার মধ্যে শতকরা ২৫ ভাগেরও বেশি মানুষের শরীরে করোনা পজেটিভ পাওয়া গেছে। এসব মানুষের বেশির ভাগই অভিবাসী শ্রমিক। সরকার বলছে, আক্রান্তদের প্রায় সবাই হালকা সংক্রমিত। মৃতের হার অনেক কম। মাত্র ১২ জন মারা গিয়েছেন।
মধ্য এপ্রিলে সরকারি একটি নির্দেশনা সেখানকার জীবনযাত্রাকে আরো জটিল করে ফেলেছে। যেসব কোম্পানি করোনা ভাইরাসের বিধিনিষেধের অধীনে বন্ধ রয়েছে, তাদেরকে শ্রমিকদের বিনাবেতন ছুটি অথবা চুক্তি বাতিল করতে অনুমতি দেয়া হয়েছে সেই নির্দেশনায়। শ্রমিকদের খাদ্য ও বাসস্থানের ব্যবস্থা সাধারণত করে থাকে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ। তবুও সরকার বলেছে, শ্রমিকদের এসব সুবিধা অবশ্যই অব্যাহতভাবে দিয়ে যেতে হবে ওইসব কোম্পানিকে। কিন্তু সাক্ষ্য দেয়ার সময় শ্রমিকরা বলেছেন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা এসব পাননি।
ফিলিপাইনের একজন বিউটিশিয়ান মাত্র দু’মাস আগে গিয়েছেন কাতারে। তিনি বলেছেন, তিনি মাত্র আধা মাসের বেতন পেয়েছেন। এরই মধ্যে লেঅফ হয়ে গেছে। তিনি বলেছেন, আমার বস বলেছেন তার কাছে কোনো অর্থ নেই। এখন ভাবছি ফিলিপাইনে আমার পরিবার কিভাবে বেঁচে আছে। তাদের তো অর্থের প্রয়োজন। আর এখন আমিই বা খাবার পাব কিভাবে? আমাদেরকে খাবার দেয়ার মতো কেউ নেই। এমনকি আমার বসও আমাকে খাবার দিচ্ছেন না।
সবচেয়ে কঠিন অবস্থায় পড়েছেন অবৈধ শ্রমিকরা ও যারা ফ্রি ভিসায় সেখানে গিয়েছেন। এসব শ্রমিক সাধারণত স্বল্প মেয়াদী এবং টুকিটাকি কাজ করে থাকেন। কারণ, তাদেরকে কোনো নিয়োগকারী নিয়মিত খাবার ও বাসস্থানের সুবিধা দেন না। এমন ফ্রি ভিসায় কাতার গিয়েছেন বাংলাদেশি ডেকোরেটর সাইদুল। তিনি বলেছেন, মধ্য মার্চ থেকে তিনি কর্মহীন রয়েছেন। সাইদুর বলেন, এরই মধ্যে আমার জমানো সব অর্থ খরচ হয়ে গেছে। এখন বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনকদের কাছ থেকে অর্থ ধার করে খাবার কিনছি এবং বাড়ি ভাড়া দিচ্ছি। কাজ ছাড়া বেঁচে থাকা খুবই কঠিন। আমি করোনায় ভয় পাই না। সমস্যাটা হলো, এখন কোনো কাজই নেই।
গৃহকর্মীরা রয়েছেন ঝুঁকির মুখে। নেপালের ‘লাইভ আউট’ নামে গৃহকর্মীদের একটি গ্রুপ আছে। তারা দিনের বেলা বিভিন্ন বাসায় গৃহকর্মের কাজ করেন। রাতে রুমে ফিরে যান। তারা গার্ডিয়ানকে বলেছেন, যেসব পরিবারকে সেবা দেন তারা তাদের সঙ্গে অবস্থান করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন তারা। এর কারণ, একদিকে ভাইরাস আতঙ্ক। অন্যদিকে শারীরিক নির্যাতনের ভয়। গৃহকর্মীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন বা যৌন নির্যাতন উপসাগরীয় অঞ্চলে খুব সাধারণ একটি বিষয়। তাই ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পরে তারা এখন সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। এ অবস্থায় ওই নারীরা বলেছেন, যে কোম্পানি তাদেরকে নিয়োগ করেছে, তারা জোর করে তাদের কাছ থেকে একটি করে কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, তাদের বেতনের জন্য ওই কোম্পানি আর দায়বদ্ধ নয়। মার্চের শুরুতে তারা প্রত্যেকে মাত্র ১০০ রিয়াল করে বেতন পেয়েছেন। ওই নারী শ্রমিকদের একজন বলেন, এখন আমাদের হাতে কোনো অর্থ নেই। খাবারের জন্য আমরা সুপারভাইজারের কাছে ভিক্ষুকের মতো হাত পাতি। কখনো তিনি আমাদেরকে দেন। কিন্তু তিনি মুখ ঘুরিয়ে নিলে আমাদের কি হবে?
বুধবার শিল্প এলাকায় বিধিনিষেধ শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। দোহা’র উপকণ্ঠে এই শিল্প এলাকায় ঠাসাঠাসি করে অবস্থান করছে শ্রমিকদের ক্যাম্প, কারখানা, গুদাম। মার্চে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের পর এর পুরোটাই বন্ধ করা হয়েছিল। এই এলাকায়ই বসবাস করেন হাজার হাজার শ্রমিক। গাদাগাদি, ঠাসাঠাসি করে ডরমেটরিতে নাজুক অবস্থায় বসবাস করেন তারা। চারদিকে আছে ধাতব ব্যারিকেড। এর প্রবেশ পথে রয়েছে পুলিশি প্রহরা।
কোম্পানিগুলোর জন্য কাতার সরকার গঠন করেছে ৬৫ কোটি ৬০ লাখ পাউন্ডের ঋণ স্কিম। উদ্দেশ্য, এই অর্থ ব্যবহার করে যাতে শ্রমিকদের কোয়ারেন্টিন করা যায় অথবা আইসোলেশনের সময়ে তাদের বেতন দেয়া যায়। কিন্তু শিল্প এলাকার অনেক শ্রমিক গার্ডিয়ানকে বলেছেন, তাদেরকে বেতন ছাড়াই ছুটিতে রাখা হয়েছে। এই শিল্প এলাকার মধ্যে দু’মাসের বেশি আটকা পড়ে আছেন ভারতীয় শ্রমিক ফিরোজ। তিনি বলেছেন, আমাদের কোম্পানি বলেছে তারা এপ্রিলের বেতন দেবে না। খাবার কেনার জন্য আমাদেরকে কিছু অর্থ দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা তাও পাইনি। কয়েকদিন আগে তারা আমাদেরকে কিছু ডিম এবং তেল দিয়েছে। এটাই সব। এখানে আমরা বহুবিধ সমস্যার মোকাবিলা করছি। এটা যেন একটা জেলখানা।
গত মাসে সরকার বলেছে, শ্রমিকদের জন্য খাদ্য, পানি ও সুরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে শিল্প এলাকায় প্রতিদিন ১০০০ ট্রাক প্রবেশ করছে। তাহলে তা যাচ্ছে কোথায়! কাতারের কম বেতনের শ্রমিকদের দুর্দশার মতোই উপসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে অন্য স্থানেও। এসব দেশের অর্থনীতির পুরোটাই নির্ভর করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, পূর্ব আফ্রিকার লাখ লাখ অভিবাসী শ্রমিকের ওপর। এর মধ্যে কুয়েতে অভিবাসীদের মধ্যে আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে আটকা পড়েছেন। তাদের বাড়ি ফিরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। তবে সৌদি আরব ইথিওপিয়ার কয়েক হাজার গৃহকর্মীদ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে।
মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠনগুলোর একটি জোট এপ্রিলে উপসাগরীয় অঞ্চলের সরকারগুলোর কাছে চিঠি লিখেছে। তাতে কম বেতনের অভিবাসী শ্রমিকরা সংক্রমণের মারাত্মক ঝুঁকিতে বলে সতর্কতা দেয়া হয়। করোনা ভাইরাসের ফলে অর্থনৈতিক যে ক্ষতি হবে তা কমিয়ে আনতে তারা সরকারগুলোর প্রতি পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানায়।
কাতার সরকার বলেছে, তারা বিনামূলে পরীক্ষা করাচ্ছে। সবাইকে চিকিৎসা দিচ্ছে। কার্যকর করেছে ব্যাপকভিত্তিক বিধিনিষেধ এবং কঠোর গাইডলাইন্স।

শেয়ার করুন

আরো খবর