বুধবার, ২৫ মে ২০২২, ১২:০১ অপরাহ্ন

দালালের কাছ থেকে সিরিয়াল কিনে করোনা টেষ্ট!

নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২০
  • ১৩১

ভ্যানচালক তরিকুল ইসলাম। জ্বর আর কাশিতে ভুগছেন কয়েকদিন ধরে। তাই করোনা টেস্ট করানোর জন্য মুগদা হাসপাতালে ঘুরছেন তিনদিন ধরে। কিন্তু সিরিয়াল মিলছে না তার। আগের দিন সন্ধ্যায় এসে বসে থাকলেও পরের দিন কোনোভাবেই পাচ্ছেন না সিরিয়াল। এভাবে তিনদিন ঘোরার পর তার করোনা টেস্টের সিরিয়াল মিলে। তরিকুল বলেন, প্রতিদিন যাত্রাবাড়ী থেকে এসে বসে থাকি। কিন্তু কোনোভাবেই সিরিয়াল পাই না।

এখানে বেশ কয়েকজন দালাল আছে। যারা আগের দিন বিকাল থেকেই বসে থাকে। পরের দিন বা রাতের কোনো রোগী যদি সিরিয়াল দেয়ার জন্য আসে, তাদের কাছে সিরিয়াল বিক্রি করে এসব দালালরা। শেষ পর্যন্ত না পেরে দেড় হাজার টাকা দিয়ে সিরিয়ালটা কিনেছি। আগামীকাল (আজ) আমার সিরিয়াল মিলেছে। দেখি কপালে কী আছে। গতকাল রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতালের সামনে অপেক্ষমান তরিকুল নিজেই জানাচ্ছিলেন নিজের এমন অসহায়ত্বের কথা। শুধু তরিকুলই নন এমন অনেক ভুক্তভোগী আছেন যারা করোনার উপসর্গ নিয়ে দিনের পর দিন ঘুরছেন হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে।

শাহেনুর আক্তার (৬৫)। বেশ কয়েকদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। শরীরে আছে জ্বরও। রিকশা চালক সন্তান তাকে নিয়ে দুই দিন এসেছিলেন মুগদা হাসপাতালে। কোনোভাবেই মিলেনি সিরিয়াল। এখানে দালালদের দখলকৃত সিরিয়াল নিতে লাগবে দুই হাজার টাকা। এই করোনা মহামারীর সময় সন্তানের আয়রোজগার তেমন একটা নেই। তাই দালালদের থেকে সিরিয়াল  কেনার মতো টাকা নেই তার কাছে। তাই গতকাল টেষ্ট না করিয়েই চলে গেছেন তিনি। বৃদ্ধ শাহেনুর আক্তারের সন্তান রিকশা চালক আলী হোসেন বলেন, আমার বৃদ্ধ মা বেশ কয়েকদিন অসুস্থ। কিন্তু গত দুই দিন ধরে এখানে আসলেও কোনোভাবেই সিরিয়াল পাচ্ছি না। এখানে কয়েকজন দালাল ইট দিয়ে বা নিজে দাঁড়িয়ে সিরিয়াল দিয়ে রাখে। পরে তারা এগুলো বিক্রি করে। কিন্তু আমার কাছে তো এতো টাকা নেই। তাই সিরিয়াল দিতে পারিনি। তারপরও একজনকে বলেছিলাম পাঁচ’শ টাকা দিবো। কিন্তু ওই দালাল রাজি হয়নি। পরে দেড় হাজার টাকা বলেছে আমি দিতে পারিনি। আমার সামনেই ওই সিরিয়াল বিক্রি করে দিয়েছে দুই হাজার টাকা। আমি আর পারবো না। চলে গেলাম। আর আসবো না।

এভাবে গত কয়েক দিন ধরে করোনা পরীক্ষা করাতে এসে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষদের। ভোক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দালাদালদের কারণে এখানে সিরিয়াল পাওয়া যায় না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও কিনতে হয় সিরিয়াল। তারা বলছেন, আশেপাশের চা দোকানদার, ডাব বিক্রেতা ও হাসপাতালে আশেপাশের মানুষজন সবার আগে এসে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকে বা ইট, পাথর দিয়ে সিরিয়াল দখল করে রাখে। ফলে বাইরের কেউ  আসলে, সিরিয়ালগুলো কিনতে হয় তাদের কাছ থেকে। পাঁচ’শ থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয় এসব সিরিয়াল।

মুগদা জেনারেল হাসপাতালের করোনা ইউনিটে সম্ভাব্য করোনা  রোগীদের  কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ  করে একই দিনে চাইল্ড  হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। প্রতিষ্ঠানটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নমুনা পরীক্ষা শেষে রিপোর্ট  তৈরি করে তা আইইডিসিআর এবং মুগদা হাসপাতালে পাঠায়। এছাড়া এখানে একটি পিসিআর মেশিন বসানো হয়েছে, এর মাধ্যমে প্রতিদিন ৯৬টি নমুনা পরীক্ষা করা হয় এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে রিপোর্ট দিয়ে দেয়ার কথা। এখানে ৯৬টি নমুনা পরীক্ষার কথা থাকলেও এর বিপরীত প্রতিদিন আড়াই’শ থেকে সাড়ে তিন’শ ভুক্তভোগী সিরিয়াল দিয়ে থাকেন। যার কারণে একদিন আগে থেকেই করোনা পরীক্ষা করতে আসাদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা থাকে। সেই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে মুগদা জেনারেল হাসপাতালের আশেপাশের একটি চক্র। তারা ভুক্তভোগীদের জিম্মি করে সিরিয়াল বিক্রি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে টেস্ট করতে আসা রোগীদের পড়তে হচ্ছে ভোগান্তিতে। অনেকে আবার  টেস্ট না করিয়েই বাড়িতে ফিরছেন হতাশ হয়ে। এমন আরেকজন রোগী ডেমরার সিরাজুল ইসলাম (৫৫)। তিনি একজন চা দোকানী। করোনা মহামারী শুরু হওয়ার পর চা দোকানটিও বন্ধ। আয় রোজগার নেই। গত দুই দিন ধরে মুগদা জেনারেল হাসপাতালে ঘুরলেও সিরিয়াল দেয়া সম্ভব হয়নি। হালকা কাশি আর জ্বর থাকলেও গতকাল ফিরে গেছেন তিনি। সিরাজুল ইসলাম বলেন, মরলে মরে যাবো। রোজা রেখে আর কষ্ট করতে পারবো না। আমার কাছে এতো টাকাও নেই যে সিরিয়াল দিবো। তিনি বলেন, আমি দালালদের দেখলে চিনতে পারবো। ওই দালাল এখানে ডাব বিক্রি করে। সন্ধ্যা হলেই লাইনে এসে দাঁড়িয়ে যায়। সকালে বা রাতে হাজার দু’য়েক টাকা বিক্রি করে দেয় সিরিয়ালটি। ভুক্তভোগীরা জানান,  রাসেল, হাবিব নামে তারা এখানকার দুইজনকে চিনেন তারা। এরা এখানে যারা দালালি করছেন। এর বাইরে এখানে প্রায় বিশ থেকে পঁচিশ জনের একটি সিন্ডিকেট রয়েছে যারা ভুক্তভোগীদের জিম্মি করছে।

এদিকে গত দুই দিন ধরে সিরিয়াল দিয়ে গতকাল ৭ নাম্বার সিরিয়াল পেয়েছেন খিলগাঁওয়ের আজিম ইসলাম বাবু। তিনি বলেন, বিরক্তির একটা সীমা আছে। প্রতিদিন আমরা দুই আড়াই’শ মানুষ লাইনে দাঁড়াই। আর টেষ্ট করানো হয় চল্লিশ পয়তাল্লিশ জনের মতো। এটাও কোনো সমস্যা নেই। হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে। কিন্তু দালালদের কারণে এই ভোগান্তি আরো বাড়ছে। এখানে সবাই তো বিপদে পড়ে আসে। এই বিপদের সময় তাদের এমন আচরণ খুব কষ্ট দেয়। অথচ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব জেনে বুঝেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এ এসব অভিযোগের বিষয়ে মুগদা  জেনারেল হাসপাতালের কোভিড-১৯ বিষয়ক টিমের  ফোকাল পারসন ডা. মাহবুবুর রহমান বলেন, এই ধরনের ঘটনা প্রথম দিক দিয়ে কয়েকটি ঘটেছিলো। তখন আনসারদের দায়িত্বে ছিলো বিষয়টি। এখন আর এরকম হচ্ছে না। যারা সিরিয়াল পায় না তারা হয়তো অভিযোগ করছে। অভিযোগ করলেই সত্য হবে এমন তো না। আমরা এখন পুরো বিষয়টি হাসপাতালের তত্ত্বাবধানে করছি। তাই এখন এমন অভিযোগের কোনো সুযোগ নেই।

শেয়ার করুন

আরো খবর