শনিবার, ২৫ জুন ২০২২, ০৮:২৬ পূর্বাহ্ন

রাজধানীর যেসব শপিংমল খুলছে কাল

নিজস্ব প্রতিবেদক:
  • আপডেট সময় শনিবার, ৯ মে, ২০২০
  • ৯৬

অবশেষে আগামীকাল রবিবার (১০ মে) থেকে পাল্টে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকার কোনও কোনও অংশের দৃশ্যপট। গত দেড় মাস ধরে টানা বন্ধ থাকার পর খুলতে যাচ্ছে বেশ কিছু দোকান, বিপণি বিতান ও শপিংমল। দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ আরও বেড়ে গেছে, আগের তুলনায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা আরও বেশি। তারপরেও চলমান রমজান, আসন্ন ঈদ ইত্যাদির কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শর্তসাপেক্ষ সীমিত পরিসরে দোকান খোলার অনুমতি দিয়েছে সরকার। এই নির্দেশনা অনুসারে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এরইমধ্যে নিজেদের বেশিরভাগ আউটলেট খোলার ঘোষণা দিয়েছে দেশীয় ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড আড়ং ও বাংলাদেশের জুতা তৈরিকারক প্রতিষ্ঠান এপেক্স ও বাটা। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় রাজধানীর মধ্যবিত্তদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য নিউমার্কেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হলেও খুলে যাবে এর উল্টো পাশের গাউছিয়া, চাঁদনী চক, ইস্টার্ন মল্লিকা, হাতিরপুলের ইস্টার্ন প্লাজা, এলিফ্যান্ট রোডের সব দোকান। খোলা হবে রাজধানীর গুলশান ১ ও ২ নম্বর সেকশনের ডিনএসসি মার্কেট এবং গাজী শপিং কমপ্লেক্সও। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ও দোকান ও মার্কেট মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

জীবন ও জীবিকার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির করোনার মধ্যেই ঈদ উপলক্ষে দোকান খোলার অনুমতি চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন জানায়। এই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যবিধি মানা বাধ্যতামূলক করে আগামীকাল রবিবার (১০ মে) থেকে রাজধানীসহ দেশের সব মার্কেট শপিংমল খোলার অনুমতি দেয় সরকার। তবে এ অনুমতি পেলেও গোল বেঁধে যায় দোকানমালিক-শ্রমিক ও ক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে। দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুতগতিতে বাড়ছে, এই পরিস্থিতিতে ক্রেতাদের পাশাপাশি নিজেদের নিরাপত্তা কীভাবে রক্ষা হবে এবং হুট করে কেউ আক্রান্ত হলে তার দায়ভার বা চিকিৎসার দায়িত্ব কে নেবে বেশিরভাগ মালিক সমিতির আলোচনায় ছিল এই প্রশ্ন। সরকার সুনির্দিষ্ট কিছু পেশাজীবীর জন্য করোনায় আক্রান্ত হলে তার দায়দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিলেও দোকান মালিক-শ্রমিকদের বিষয়ে কিছু বলেনি। ফলে নিজেদের নিরাপত্তার পাশাপাশি ক্রেতাদের নিরাপত্তার ইস্যুও ছিল তাদের আলোচনায়। এ কারণেই ব্যবসায়ীরা নিজেরা বসে এই সমস্যার সমাধান করতে না পারায় ব্যবসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হলেও ঈদের আগে দোকান খোলার বিষয়ে একমত হতে পারেননি। ফলে মার্কেট ও শপিং মলগুলো না খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বেশিরভাগ দোকান মালিক সমিতি। আর বসুন্ধরা শপিং মল ও যমুনা ফিউচার পার্ক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এই দুটি মার্কেটের মালিকপক্ষ।

সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা বিবেচনায় নিয়ে রাজধানী ও দেশের প্রধান বড় দুই শপিং কমপ্লেক্স বসুন্ধরা সিটি ও যমুনা ফিউচার পার্ক এবং এর পরপরই ঢাকা নিউ মার্কেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। কাল রবিবার থেকে এ তিনটি মার্কেট খুলছে না। একই কারণে আপাতত মার্কেট না খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেট, মৌচাক মার্কেট ও আনারকলি মার্কেট, মোতালেব প্লাজা। একই সঙ্গে এ সময় দেশের সব সোনার দোকানও বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষযটিতে গুরুত্ব দিয়ে রাজধানীর গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া সব পাইকারি মার্কেট বিশেষ করে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স, এনেক্সকো টাওয়ার, মহানগর কমপ্লেক্স, ঢাকা ট্রেড সেন্টার, ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট, সুন্দরবন সুপার মার্কেট, জাকির প্লাজা, নগর প্লাজা, সিটি প্লাজা, গুলিস্তান পুরান বাজার, বঙ্গ ইসলামিয়া সুপার মার্কেটও বন্ধ থাকবে।

এদিকে ব্যবসা, অর্থনীতি ও কর্মচারীদের জীবিকার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে গাউছিয়া, রাজধানীর গুলশান ১ ও ২ নম্বর সেকসনের ডিনএসসি মার্কেট, চাঁদনী চক, ইস্টার্ন প্লাজা, ইস্টার্ন মল্লিকা, গাজী শপিং কমপ্লেক্স এবং এলিফ্যান্ট রোডের সব দোকান খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব মার্কেট সমিতির কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার ফলে তাদের ব্যবসার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জমানো পুঁজি ভেঙে খাওয়ার ফলে তারা এখন অনেকটাই অসহায় হড়ে পড়েছেন। কর্মচারীরা অনাহারে অর্ধহারে দিনাতিপাত করছেন। দোকান বা ব্যবসা চালু হলে তারা কিছুটা হলেও অর্থের মুখ দেখবেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বাস্থ্যবিধি মানার নিশ্চয়তা দিয়ে ১০ মে রবিবার থেকে সীমিত আকারে দেশীয় ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড আড়ং ও বাংলাদেশের জুতা তৈরিকারক প্রতিষ্ঠান এপেক্স ও বাটা। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নিজ নিজ সিদ্ধান্তে আউটলেট খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশীয় ফ্যাশন হাউসগুলো।

এদিকে দেশের বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপের গণমাধ্যম উপদেষ্টা মোহাম্মদ আবু তৈয়ব জানিয়েছেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের নির্দেশেই মার্কেট না খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে মার্কেটের ব্যবসায়ীরাও একমত পোষণ করেছেন। তাদের সঙ্গে আমাদের আলাপ-আলোচনা হয়েছে। বসুন্ধরা গ্রুপের সব সিদ্ধান্ত মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করবেন, এমন শর্তেই চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন তারা।’

ঈদের সময় বসুন্ধরা সুপার মল না খোলার সিদ্ধান্তে সরকারের কোনও আদেশ বা নির্দেশ অমান্য করা হবে না জানিয়ে মোহাম্মদ আবু তৈয়ব জানান, ‘শুধু বাংলাদেশ নয়, এটি এই অঞ্চলের বৃহৎ শপিং মল। এখানে সীমিত পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করা বা দোকান খোলার কোনও সুযোগ নেই। ঈদের সময় এ মার্কেট খুললে প্রতিদিন কয়েক লাখ মানুষের সমাগম হবে। এটা কোনোভাবেই রোধ করা যাবে না। তাই এখানে স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দেবেই। এতে কোনও সন্দেহ নেই। তাই সাধারণ মানুষের জীবনের কথা চিন্তা করেই বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান এমন সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।’

এদিকে যমুনা গ্রুপের পরিচালক ডক্টর মোহাম্মদ আলমগীর আলম জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ সুরক্ষা প্রস্তুতি সত্ত্বেও করোনা মহামারি সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাওয়ায় হাজারও মানুষের সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি এড়াতে যমুনা ফিউচার পার্ক না খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ, যমুনা গ্রুপ মনে করে দেশ আগে, জীবন আগে, ব্যবসা পরে। তাই যমুনা গ্রুপ শপিং মল নিজেরাই বন্ধ রেখে আয়ের পথে তালা দিয়েছে দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসার তাগিদেই।

অপরদিকে গুলশান-১ এর ডিএনসিসি মার্কেটের একাংশের সাধারণ সম্পাদক মো. জয়নাল আবেদীন জানান, দোকান খোলার বিষয়ে মার্কেটের ব্যবসায়ীদের একটি অংশ চাইলেও অপর একটি অংশের কিছুটা আপত্তি রয়েছে। তবে আমরা সরকারের নির্দেশনা মানতে চাই। আমরা  সীমিত পরিসরে ১০ মে রবিবার থেকে মার্কেট খুলছি। আমরা ফোনে ফোনে প্রায় সবার মতামত নিয়েছি।

এদিকে গুলশান-২ এর ডিএনসিসি মার্কেটের সভাপতি আবুল কাশেম জানিয়েছেন, আমরা আমাদের মার্কেট সরকারের নির্দেশনা মেনে আগামী ১০ মে, রবিবার থেকে খুলে দিচ্ছি। এ বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত। মার্কেটের ব্যবসায়ীদের মতামত নেওয়া হয়েছে দোকানিরা দোকান খোলার বিষয়ে একমত।

আড়ংয়ের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, ১০ মে রবিবার থেকে আমরা আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো খুলছি। তবে আউটলেট খোলার ক্ষেত্রে আমরা সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছি গ্রাহক ও বিক্রয়কর্মীদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার বিষয়টি। গ্রাহকদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রথমত দূরত্ব মানার বিষয়টি নিশ্চিত করছি, তারপর কেনাবেচা।

তারা দোকানে প্রবেশের ক্ষেত্রে অগ্রিম এন্ট্রির ব্যবস্থা রাখবেন বলেও জানান। আর আউটলেটের ভেতর একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা অবস্থানের সময় পাবেন।

বাটা কোম্পানির ম্যানেজার জোবায়ের ইসলাম জানিয়েছেন, সরকার আগামী ১০ মে থেকে দোকান খোলা রাখার অনুমতি দিয়েছে সে কারণে  আমরা সেই সুযোগ নেবো। যেসব স্টোর খোলা থাকবে, সেগুলোতে পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মানা হবে। এ জন্য আমরা পর্যাপ্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজারের ব্যবস্থা করেছি। ক্রেতারা জীবানুমুক্ত হয়ে স্টোরে আসার অনুমতি পাবেন। তবে শপিং মল বন্ধ থাকায় অথবা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভর করে কিছু স্টোর বন্ধ থাকতে পারে।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেছেন, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির আবেদনের প্রেক্ষিতে রবিবার থেকে সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত দোকানপাট ও শপিং মল খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে দোকান খোলা বা না খোলার বিষয়ে কোনও জোরাজুরি নেই। তবে যারা খুলবেন তারা অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন। কেউ চাইলে তার দোকান ও মার্কেট নাও খুলতে পারেন।

উল্লেখ্য, গত ৪ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসকদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতির মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে দোকান ও শপিংমল ১০ মে থেকে খোলার কথা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। তবে বিকেল ৪টার মধ্যে বন্ধ করতে বলা হয়েছে।

এতে বলা হয়, কোভিড-১৯ রোগের বিস্তাররোধ এবং পরিস্থিতির উন্নয়নের লক্ষ্যে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার আগামী ৭ থেকে ১৬ মে পর্যন্ত সাধারণ ছুটি/জনসাধারণের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা/সীমিত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে শর্তাদি বিবেচনা করে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় অভ্যন্তরীণভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য, দোকানপাট, শপিংমলসহ অন্যান্য কার্যাবলী ১০ মে থেকে সীমিত আকারে খুলে দিতে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হলো। তবে এক্ষেত্রে আন্তঃজেলা ও আন্তঃউপজেলা যোগাযোগ/চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

হাট-বাজার, ব্যবসা কেন্দ্র, দোকানপাট ও শপিংমল সকাল ১০টায় খুলবে এবং বিকেল ৪টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রতিটি শপিংমলে প্রবেশের ক্ষেত্রে স্যানিটাইজার ব্যবহারসহ স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত সতর্কতা গ্রহণ করার কথা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে ক্রেতার নিজ এলাকার ২ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত শপিংমলে কেনাকাটা করতে নির্দেশনা দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ডিএমপি বলেছে, প্রত্যেক ক্রেতাকে নিজ পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড/পাসপোর্ট/ড্রাইভিং লাইসেন্স) ইত্যাদি সঙ্গে রাখতে হবে। ঢাকা মহানগরীতে শপিংমল ও মার্কেট খোলা রাখার বিষয়ে ১৪টি নির্দেশনা দিয়েছে ডিএমপি।

শেয়ার করুন

আরো খবর