আর্জেন্টিনা-স্পেন মধ্যকার বিশ্বকাপ ফাইনাল চলাকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আর্জেন্টিনায় দুই সমর্থকের মৃত্যু হয়েছে। দেশটির জরুরি চিকিৎসাসেবা সংস্থা (স্যাম) জানায়, রাজধানী বুয়েনস আইরেসে পৃথক দুটি ঘটনায় ৬৭ ও ৮৮ বছর বয়সী দুই ব্যক্তি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে (হৃদরোগ) মারা যান। একই সময়ে আরও এক ৭২ বছর বয়সী ব্যক্তি হৃদরোগজনিত জটিলতায় হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন, তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক।
প্রথম ব্যক্তির মৃত্যুর খবর রোববার (১৯ জুলাই) স্থানীয় সময় রাত ৮টার দিকে জানা যায়। আর দ্বিতীয় ব্যক্তির মৃত্যুর বিষয়টি রাত ১০টার দিকে পাওয়া যায়।
জরুরি চিকিৎসাসেবা সংস্থা স্যাম জানিয়েছে, দুজনকেই চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে হৃদরোগে আক্রান্ত আরও এক ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়, যিনি এখনো সংকটাপন্ন অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
স্যামের সরকারি নথি অনুযায়ী, ৬৭ বছর বয়সী ওই ব্যক্তির জন্য জরুরি কল আসে সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে। ঘটনাস্থল ছিল বুয়েনস আইরেসের মনসেরাত এলাকার সারান্দি ও আদোলফো আলসিনা সড়কের একটি বাসা। চিকিৎসাকর্মীরা পৌঁছানোর আগেই উপস্থিত লোকজন তাকে কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন (সিপিআর) দিচ্ছিলেন।
স্যামের চিকিৎসকরা দীর্ঘ সময় ধরে পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা চালালেও তার অবস্থার উন্নতি হয়নি। শেষ পর্যন্ত ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।
দ্বিতীয় ভুক্তভোগী, ৮৮ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি, বিকেল ৫টা ৩৯ মিনিটে একই ধরনের হৃদরোগজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হন। জরুরি বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়, শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ার পর তার মেয়ে জরুরি নম্বরে যোগাযোগ করেন। তখন তিনি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে ছিলেন।
সিপিআর দেওয়ার পর তাকে দ্রুত দুরান্দ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে পাঁচ ঘণ্টার কিছু বেশি সময় চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়। হাসপাতালের চিকিৎসকরা বিষয়টি বুয়েনস আইরেস সিটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে নিশ্চিত করেন।
একই ঘটনায় আক্রান্ত ৭২ বছর বয়সী আরেক ব্যক্তি বর্তমানে আলভারেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার শারীরিক অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক। সন্ধ্যা ৬টা ২২ মিনিটের দিকে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট ও বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষ হওয়ার পর রাত ৮টা ৮ মিনিটে এই তিনটি ঘটনার তথ্য প্রকাশ্যে আসে।
হৃদরোগে আক্রান্তদের পাশাপাশি ফাইনাল ঘিরে উদযাপনের সময় বুয়েনস আইরেসের ওবেলিস্ক এলাকা ও আশপাশে আরও বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
স্যামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সবচেয়ে গুরুতর দুর্ঘটনাটি ঘটে ৪৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি লাভাইয়ে ও নুয়েভে দে হুলিও অ্যাভিনিউয়ের মোড়ে প্রায় চার মিটার উঁচু থেকে পড়ে যান। এতে তার বাঁ পায়ে গুরুতর ভাঙন ও স্থানচ্যুতি (লাক্সোফ্র্যাকচার) হয় এবং তাকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এ ছাড়া ৪০ বছর বয়সী এক নারী হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েন। ঘটনাস্থলে তার জ্ঞান না ফেরায় জরুরি চিকিৎসাসেবা দিয়ে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
উদযাপনের সময় অতিরিক্ত মদ্যপানজনিত অসুস্থতা এবং বিভিন্ন ধরনের আঘাতের ঘটনাও ঘটে। ২৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তি অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনের পর হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া (ব্র্যাডিকার্ডিয়া) ও নিম্ন রক্তচাপে আক্রান্ত হন। ২৩ বছর বয়সী আরেক তরুণ অসুস্থ হলেও চিকিৎসা নিতে অস্বীকৃতি জানান।
এ ছাড়া বোতলের আঘাতে এক ব্যক্তির হাত ও মাথার ত্বক কেটে যায়। মারামারি ও পড়ে যাওয়ার ঘটনায় কয়েকজন মুখমণ্ডল ও নাকে আঘাত পান। সেরিতো এলাকায় ৩৪ বছর বয়সী এক নারীর শরীরের বিভিন্ন স্থানের ছড়ে যাওয়া ক্ষতের চিকিৎসা দেওয়া হয়। আরেক ব্যক্তি নিচের অঙ্গে আঘাত পান।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ৪৪ বছর বয়সী এক নারী আতঙ্কজনিত (প্যানিক অ্যাটাক) সমস্যায় আক্রান্ত হলে তাকে রামোস মেহিয়া হাসপাতালে নেওয়া হয়। পাশাপাশি হাঁপানির তীব্র আক্রমণ ও স্নায়বিক জটিলতায় আক্রান্ত আরও কয়েকজনকে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।
আর্মেনিয়া ইমিগ্রান্টস স্কয়ারে সংঘর্ষে আহত তিনজন পুরুষকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হলেও তাদের কাউকে হাসপাতালে নিতে হয়নি।
এ ধরনের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। মাত্র এক সপ্তাহ আগে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ডের ম্যাচ চলাকালেও স্যাম হৃদরোগে একজনের মৃত্যুর খবর জানিয়েছিল। সেদিন আরও ছয়টি হৃদরোগসংক্রান্ত জরুরি ঘটনারও তথ্য প্রকাশ করা হয়। নিহত ব্যক্তি ছিলেন ৫১ বছর বয়সী একজন পুরুষ।
সেই ম্যাচে বুয়েনস আইরেস শহরে মোট সাতজন হৃদরোগসংক্রান্ত জটিলতায় আক্রান্ত হন। তাদের মধ্যে চারজন পুরুষ এবং তিনজন নারী ছিলেন। সবাই প্রাপ্তবয়স্ক। তাদের মধ্যে বুকে ব্যথা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট এবং প্রাণঘাতী করোনারি জটিলতার ঘটনা ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অত্যন্ত আবেগঘন ও চাপপূর্ণ ফুটবল ম্যাচের সময় হৃদরোগসংক্রান্ত সমস্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ইনফোবায়ে-এর সঙ্গে কথা বলা বিভিন্ন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ চলাকালে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে বুকে ব্যথা, অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন (অ্যারিদমিয়া) এবং অন্যান্য হৃদরোগজনিত সমস্যার রোগীর সংখ্যা সাধারণ সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ মাছুম বিল্লাহ
ফোন: +8801715184181
ইমেইল: crimeexpressbd@gmail.com
ওয়েবসাইট: www.crimeexpress.net
প্রধান কার্যালয় : ৩৮৯/এ/১ ডি আইটি রোড, পশ্চিম রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।