ফরিদপুরে গোয়েন্দা পুলিশের হেফাজতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদ ওরফে প্রান্তর মৃত্যুর ঘটনায় ডিবির তৎকালীন ওসিসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার সুপারিশ করা হয়েছে।
জেলা পুলিশের তিন সদস্যের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এ সুপারিশ পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
অভিযুক্তরা হলেন- ফরিদপুর ডিবি পুলিশের তৎকালীন ওসি মো. আলমগীর হোসেন, উপপরিদর্শক মো. আহাদুজ্জামান ও মোতাহার আলী, সহকারী উপপরিদর্শক মো. হাজিকুল ইসলাম, কনস্টেবল আবু সুফিয়ান, রাকিব মোল্লা, মনিরুজ্জামান, মো. রাকিবুল ইসলাম, ফরহাদ হোসেন মিয়া, চম্পা হালদার ও মো. সবুজ মোল্লা। ঘটনার পর গত ২২ জুন ওসিসহ সংশ্লিষ্ট ১১ পুলিশ সদস্যকে ফরিদপুর পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হয়।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, তদন্তে অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠেছে। সে কারণে বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে প্রত্যেকের দায় নির্ধারণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এর আগে ২০ জুন বিকেলে মধুখালী পৌরসভার পশ্চিম গোন্ধারদিয়া এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে থেকে ইশতিয়াককে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। হেফাজতে থাকা অবস্থায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন, ২১ জুন সকালে সেখানে প্রান্তের মৃত্যু হয়।
প্রান্ত মধুখালির পশ্চিম গোন্ধারদিয়া এলাকার বাসিন্দা এবং ফরিদপুর আইন কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ফরিদপুর চিনিকলের মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।
মৃত্যুর পরদিন ডিবির এসআই আহাদুজ্জামান বাদী হয়ে ইশতিয়াককে আসামি করে মধুখালী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা করেন। মামলায় দাবি করা হয়, তার কাছ থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে অভিযানের সময় ইশতিয়াক পালানোর চেষ্টা করেন এবং পরে নিজের প্যান্টের পকেট থেকে গাঁজা বের করে দেন।
তবে এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি ভাইরাল হওয়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, অভিযানটি রাতের পরিবর্তে দিনের বেলায় পরিচালিত হয়েছে এবং ওই সময় ইশতিয়াকের পরনে প্যান্ট নয়, লুঙ্গি ছিল। ভিডিওতে ডিবি সদস্যদের তাঁকে মারধর ও তল্লাশি করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে এক সদস্য কিছু দূরে থাকা একটি বস্তু দেখিয়ে ‘এই যে এক টোপলা’ বলে চিৎকার করেন।
মাদক উদ্ধারের মামলায় সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা দুই ব্যক্তি- মো. আলমগীর হোসেন ও বিনয় সাহা। পরে তদন্ত কমিটি ও গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনার সময় তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না। তাদের দাবি, তারা প্রায় ১০০ মিটার দূরে অবস্থান করছিলেন এবং পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
ইশতিয়াক আরিফ প্রান্তর মা খাদিজা আক্তার অভিযোগ করেন, ছেলেকে ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে প্রথমে ৬৫ হাজার টাকা এবং পরে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। তিনি জানান, নির্ধারিত অর্থ নিয়ে ফরিদপুরে গেলেও জীবিত ছেলের পরিবর্তে তার মরদেহ গ্রহণ করতে হয়েছে। তদন্ত কমিটির কাছেও তিনি একই অভিযোগ তুলে ধরেন।
ঘটনার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্য ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) মো. শামসুল আজম এবং জেলা স্পেশাল ব্রাঞ্চের ওসি মোশাররফ হোসেন। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী বলেন, অভিযানে অংশ নেওয়া প্রত্যেক সদস্য কোনো না কোনোভাবে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে কার দায় কতটুকু, তা বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি তদন্ত প্রতিবেদনের নির্দিষ্ট অসংগতি, যেমন অভিযান পরিচালনার সময়, মাদক উদ্ধারের দাবি, সাক্ষীদের উপস্থিতি কিংবা অর্থ দাবির অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মোঃ মাছুম বিল্লাহ
ফোন: +8801715184181
ইমেইল: crimeexpressbd@gmail.com
ওয়েবসাইট: www.crimeexpress.net
প্রধান কার্যালয় : ৩৮৯/এ/১ ডি আইটি রোড, পশ্চিম রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।