বর্তমান বিশ্বে কর্মক্ষেত্রের রূপান্তর দ্রুততর হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিমোট ওয়ার্ক এবং সহস্রাব্দের প্রজন্মের (মিলেনিয়ালস) কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের ফলে নিয়োগকর্তা বা এমপ্লয়ারের ভূমিকা কেবল বেতনভুক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ (এইচবিআর) এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বারবার উঠে এসেছে যে, প্রতিষ্ঠান এখন কেবল শ্রম কেনে না, বরং একটি ‘অভিজ্ঞতা’ বা ‘সংস্কৃতি’ অফার করে। এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডিং এখন আর কেবল মার্কেটিং বিভাগের বিষয় নয়, এটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকার মূল চালিকাশক্তি।
এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডিং কী এবং কেন?
এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডিং হলো একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও মূল্যবোধের সমষ্টি, যা সম্ভাব্য ও বর্তমান কর্মীদের কাছে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি আকর্ষণীয় কর্মস্থল হিসেবে তুলে ধরে। সহজ কথায়, আপনার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বাইরের মানুষ কী জানে এবং কর্মীরা ভেতরে কেমন অনুভব করে—এর সমন্বয়ই হলো ব্র্যান্ডিং। হার্ভার্ডের গবেষকদের মতে, ব্র্যান্ডিং এখন আর কেবল বিজ্ঞাপনের বিষয় নয়, এটি প্রতিষ্ঠানের ‘কোর ডিএনএ’-তে নিহিত থাকতে হয়।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও পরিবর্তনের হাওয়া
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ‘অক্সফোর্ড সাইড বিজনেস স্কুল’-এর গবেষণায় দেখা গেছে, আজকের মেধাবীরা এমন প্রতিষ্ঠানের খোঁজে থাকেন, যেখানে ‘উদ্দেশ্য’ বা মুনাফার চেয়েও বড় কোনো লক্ষ্য থাকে। গতানুগতিক করপোরেট সংস্কৃতির চেয়ে এখন কর্মীরা ‘সাইকোলজিক্যাল সেফটি’ বা মানসিক নিরাপত্তা ও নমনীয়তাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। কোভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্বে যারা এই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে পেরেছে, তারাই সেরা মেধাবীদের ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
এমপ্লয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠানকে ধারণ করার কৌশল
একটি আধুনিক ও প্রভাবশালী এমপ্লয়ার ব্র্যান্ড গড়ে তোলার জন্য বেশ কয়েকটি মৌলিক কৌশল অবলম্বন করা জরুরি তারমধ্যে নিম্নোক্ত চারটি কৌশল খুবই কার্যকর-
উদ্দেশ্যভিত্তিক সংস্কৃতি (পারপাস-ড্রিভেন কালচার): হার্ভার্ডের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কর্মী তাদের কাজের সাথে প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর লক্ষ্যের সংযোগ খুঁজে পান, তাদের উৎপাদনশীলতা অন্যদের চেয়ে বহুগুণ বেশি। প্রতিষ্ঠানকে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হতে হবে, যেখানে কর্মীরা অনুভব করবেন তারা শুধু কাজ করছেন না, বরং একটি সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছেন।
মানসিক নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তি (সাইকোলজিক্যাল সেফটি অ্যান্ড ইনক্লুশন): অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ‘ইনক্লুসিভ লিডারশিপ’ (অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্ব)-এর ওপর। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে কর্মীরা নির্ভয়ে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারেন। যখন একজন কর্মী অনুভব করেন যে তার কণ্ঠস্বর শোনা হচ্ছে, তখন তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে ওঠেন।
নমনীয়তা ও ভারসাম্য (ফ্লেক্সিবিলিটি অ্যান্ড ওয়েল-বিয়িং): বর্তমান প্রজন্মের কাছে নমনীয় কর্মঘণ্টা (ফ্লেক্সিবল ওয়ার্কিং আওয়ারস) এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি একটি মৌলিক চাহিদা। কাজের চাপের বাইরেও কর্মীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া একটি এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডের বড় দিক। আধুনিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ‘ওয়ার্ক-লাইফ ব্যালেন্স’ থেকে বেরিয়ে ‘ওয়ার্ক-লাইফ ইন্টিগ্রেশন’-এর দিকে ঝুঁকছে।
৪. ডিজিটাল এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডিং: আজকের মেধাবীরা চাকরির আবেদন করার আগে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সোশ্যাল মিডিয়া ও গ্লাসডোরের মতো প্ল্যাটফর্মে খোঁজ নেন। লিঙ্কডইন বা অন্যান্য মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কর্মীরা কীভাবে কাজ করছেন, তাদের সাফল্যের গল্পগুলো কীভাবে শেয়ার করা হচ্ছে—এসবই এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ। প্রতিষ্ঠানকে তার নিজস্ব ভয়েস বা কণ্ঠস্বর খুঁজে পেতে হবে।
এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডিংয়ের কার্যকর ধাপসমূহ
এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডিং শুধু বাইরের মানুষের জন্য নয়, এটি শুরু করতে হয় ভেতর থেকে (ইনসাইড-আউট অ্যাপ্রোচ) যেখানে অন্তত চারটি ধাপ অনুসরণ করা জরুরি-
প্রথমত, এমপ্লয়ি ভ্যালু প্রপোজিশন (ইভিপি) নির্ধারণ: আপনার প্রতিষ্ঠানে কাজ করলে একজন কর্মীর লাভ কী? কেবল আর্থিক সুবিধা নয়, দক্ষতা উন্নয়ন, নেটওয়ার্কিং এবং ক্যারিয়ারের উন্নতির নিশ্চয়তা হলো একটি শক্তিশালী ইভিপি। এটি স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কর্মীদের মুখপাত্র (এমপ্লয়ি অ্যাডভোকেসি) বানানো: প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হলো আপনার কর্মীরাই। তারা যখন তাদের ব্যক্তিগত সোশ্যাল হ্যান্ডেলে প্রতিষ্ঠানের প্রশংসা করেন, তখন তা বাইরের বিজ্ঞাপনের চেয়ে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়।
তৃতীয়ত, কাজের পরিবেশের ডিজিটালাইজেশন: এখনকার কর্মীরা এমন প্রযুক্তি ও পরিবেশ আশা করেন, যা তাদের কাজকে সহজ করে। অপ্রয়োজনীয় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে কর্মক্ষেত্রকে আরও গতিশীল করতে হবে।
চতুর্থত, ক্রমাগত লার্নিং কালচার: হার্ভার্ডের মতে, যারা শিখছে না, তারা পিছিয়ে পড়ছে। যে প্রতিষ্ঠান কর্মীদের নতুন প্রযুক্তি ও স্কিল শেখার সুযোগ করে দেয়, মেধাবীরা সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি বেশি অনুরাগী হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাস্তবতা
বাংলাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠানই মনে করে এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডিং মানেই বড় বড় সংবাদপত্রে চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেওয়া। কিন্তু এই ধারণা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদের দেশেও এখন মেধাবী তরুণদের সংখ্যা বাড়ছে, যারা কেবল ভালো বেতনের পেছনে ছুটছে না, বরং খুঁজছে একটি সম্মানজনক ও প্রগতিশীল কর্মপরিবেশ।
আমাদের দেশের ব্যাংক, টেলিকম বা স্টার্টআপ—যে খাতের প্রতিষ্ঠানই হোক না কেন, তাদের উচিত স্থানীয় মেধাবীদের জন্য একটি ‘গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড’ কর্মক্ষেত্র তৈরি করা। যখন একটি প্রতিষ্ঠান তার কর্মীদের সাথে স্বচ্ছ আচরণ করবে, তাদের ক্যারিয়ারের মালিকানা দিতে শেখাবে, তখন এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডিং আপনাআপনিই তৈরি হবে।
এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডিং কোনো একদিনের প্রজেক্ট নয়, এটি একটি ধারাবাহিক যাত্রা। অক্সফোর্ড এবং হার্ভার্ডের গবেষকদের মূল কথা হলো—মানুষ এমন কোথাও থাকতে চায় না, যেখানে তাকে কেবল একটি ‘রিসোর্স’ হিসেবে দেখা হয়। মানুষ সেখানে থাকতে চায়, যেখানে তাকে একজন ‘মানুষ’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড গড়ে তোলার উপায় হলো আপনার কর্মীদের সাফল্যের গল্পগুলো বিশ্বের সামনে তুলে ধরা এবং প্রতিটি কর্মীকে প্রতিষ্ঠানের অংশীদার হিসেবে অনুভব করানো।
যেসব প্রতিষ্ঠান আজ কর্মীদের জন্য বিনিয়োগ করবে, আগামী দিনে তারাই বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ভোগ করবে। মনে রাখতে হবে, একটি প্রতিষ্ঠানের আসল সম্পদ তার ব্যালেন্স শিটের টাকা নয়, বরং সেই মানুষগুলো, যারা প্রতিদিন সকালে অফিসে আসার প্রেরণা খুঁজে পান। এমপ্লয়ার ব্র্যান্ডিং হলো সেই প্রেরণারই দালিলিক রূপ।
লেখক: ব্যাংকার, উন্নয়ন গবেষক ও লেখক
মন্তব্য করুন