একটি সমাজ সাংস্কৃতিকভাবে কতটা উন্নত, সমৃদ্ধ ও রুচিশীল তা বোঝা যায় সেখানকার মানুষের সামগ্রিক বিচার, বিবেচনাবোধের ওপর। সেই বিবেচনাবোধ বা বিচারের মানদণ্ড যদি হয় কোনো নারীর পোশাক, তবে তা যে পিছিয়ে পড়া এবং কোনো বিচারেই তা আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, তা বলাই বাহুল্য। অতি সম্প্রতি দেশের একজন নারী শিক্ষককে নিয়ে দেশব্যাপী তীব্র আলোচনা-সমালোচনার ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে, তা সমাজের দুটো দিক স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়েছে। একটা নারীর প্রতি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং আরেকটা এর বিপরীত। একটা নেতিবাচক, আরেকটা অবশ্যই ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক।
নারী শিক্ষকের নাম বিউটি রানী পাল। তিনি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। শিক্ষকতায় অবদানের জন্য তিনি এর আগে শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের মর্যাদাও পেয়েছেন। তার একটি রিল ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়। ভিডিওতে দেখা যায়, মৃদু বাতাসে উড়ছে তার শাড়ির আঁচল। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধীরলয়ে নাচছেন বিউটি পাল। সে নাচের ভিডিওর সঙ্গে জনপ্রিয় বাংলা গান—‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’ বাজছে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য ব্যবহারকারী নেতিবাচক মন্তব্য করেন। শুরু হয় কুৎসিত ট্রল। জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার ভিডিওটি ভাইরাল হলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে বিউটি পাল ভিডিওটি সরিয়েও নেন। তার অপরাধ কী? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, একজন শিক্ষিকা হয়ে তিনি কি এভাবে প্রকাশ্যে নাচগান করতে পারেন? তার এমন আচারণ কি অশালীন নয়? অবশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা এ নারীর প্রতি তাদের বিষোদ্গার উগরে দিয়েছেন, সেখানে তারা কোনো প্রশ্নের অবকাশ রাখেননি। তারা আরও এক কাঠি এগিয়ে! অর্থাৎ তারা নিজেরাই রায় প্রদান করেছেন, সেগুলো অশ্রাব্য ভাষায়। তবে অপর একটি চিত্রও আছে। সেটা অত্যন্ত ইতিবাচক। সামাজিকভাবেই এই নোংরা প্রবণতা প্রতিহত হয়েছে। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ এটিকে সাইবার বুলিং হিসেবে বিবেচনা করা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ভুক্তভোগী নারী শিক্ষকের পাশে দাঁড়িয়েছেন অসংখ্য মানুষ। এর প্রতিবাদে তারা অনেক ইতিবাচক ভিডিও এবং রিল বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, এটি হচ্ছে একজন মানুষ হিসেবে তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, যে অধিকার ভোগ করবার পূর্ণ অধিকার তার আছে। দ্বিতীয়ত, একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসেবে যে অশালীনতা ও অনৈতিকতার অভিযোগ আনা হয়েছে, তাও সঠিক নয়। কারণ তিনি যথেষ্ট শালীন উপায়েই ছিলেন। আরও ইতিবাচক দিক হচ্ছে, সরকারের সংশ্লিষ্টজনদের সুবিবেচনাপ্রসূত প্রতিক্রিয়া। অর্থাৎ এই নারীবিদ্বেষী মৌলবাদী প্রচারণার কাছে সরকারের পক্ষ থেকে নতি স্বীকার না করা। এই কারণে সরকার সংশ্লিষ্টদের আমরা সাধুবাদ জানাই। কেননা, অতীতে এরকম বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে ভিন্ন আচরণের নজির রয়েছে অহরহ, যা অনাকাঙ্ক্ষিত।
আমরা মনে করি, একবিংশ শতাব্দীর এ আধুনিক সময়ে রাষ্ট্রের কোনো নাগরিককে সংকীর্ণ দৃষ্টিতে দেখার অবকাশ নেই। স্মরণে রাখতে হবে, বাংলাদেশের ইতিহাসে মহান মুক্তিযুদ্ধসহ যত গণআন্দোলন সংঘটিত হয়েছে, প্রতিটির মূল চেতনা ছিল বৈষম্যহীন, স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন; প্রত্যেক নাগরিকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। সেই সমাজে একজন মানুষকে ‘নারী’র তকমা বা ‘নারী’ হওয়ার অজুহাতে তার অধিকার খর্বের চেষ্টা মঙ্গলজনক নয়। সুতরাং ব্যক্তিগত পছন্দ ও স্বাধীনতা ব্যক্তিগত হিসেবে বিবেচনাই সমীচীন। অবশ্য এ দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন সহজ নয়। এ জন্য দরকার উপযুক্ত শিক্ষা ও পরিবেশ। প্রয়োজন মনের বিশুদ্ধ বিকাশ। তাহলেই বদলাবে দৃষ্টি।
মন্তব্য করুন