বিশেষ প্রতিনিধি: পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার দারুলহুদা নেছারিয়া এতিমখানায় সরকারি বরাদ্দের অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নথিতে ১৭৫ জন এতিম ও দুস্থ শিশুর জন্য প্রতি মাসে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের তথ্য থাকলেও সরেজমিনে এতিমখানাটিতে অবস্থানরত শিশুর সংখ্যা, আবাসন ব্যবস্থা ও দৈনন্দিন কার্যক্রমে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এ ঘটনায় সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। জানা গেছে, ভান্ডারিয়া উপজেলার দারুলহুদা গ্রামে পিরোজপুর-মঠবাড়িয়া মহাসড়কের পাশে আল-গাযযালী ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে দারুলহুদা নেছারিয়া এতিমখানাটি অবস্থিত। সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটিতে সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী ১৭৫ জন এতিম ও দুস্থ শিশুর জন্য জনপ্রতি মাসে ২ হাজার টাকা হিসেবে মোট ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, বরাদ্দের অর্থ এতিমখানার সভাপতি মনিরুল হক জমাদ্দার ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক খানের যৌথ ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ আব্দুল্লাহ মাহমুদসহ সংশ্লিষ্টরা প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন। সম্প্রতি সরেজমিনে এতিমখানাটি পরিদর্শনকালে জরাজীর্ণ অবস্থায় আনুমানিক ২০ থেকে ২৫টি বেড দেখা যায়। পরিদর্শনের সময় সেখানে ১০ থেকে ১২ জন শিশুকে অবস্থান করতে দেখা গেছে। সেখানে থাকা কয়েকজন শিশুর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এতিমখানাটিতে মোট ৪০ থেকে ৪৫ জন শিশু রয়েছে বলে তারা দাবি করে। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের বাবুর্চি জানান, তিনি প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ৬০ জনের খাবার রান্না করেন। এতিমখানায় বাস্তবে অবস্থানরত শিশুদের সংখ্যা ও সরকারি নথিতে উল্লেখিত ১৭৫ জন সুবিধাভোগীর সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য থাকায় সরকারি বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। এ বিষয়ে সরকারি বরাদ্দ, সুবিধাভোগীদের তালিকা ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র দেখতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ আব্দুল্লাহ মাহমুদ কোনো তথ্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি এ বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক খানের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরে সাধারণ সম্পাদক আব্দুল খালেক খানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করে এতিম ও দুস্থ শিশুদের হাজিরা খাতা, ভর্তি সংক্রান্ত জন্মনিবন্ধন, পিতা-মাতার জাতীয় পরিচয়পত্র এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্রসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখতে চাওয়া হয়। এ সময় তিনি জানান, তিনি বরিশালে অবস্থান করছেন। এরপর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তীতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এদিকে, বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও অন্যদের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রতিষ্ঠানের সভাপতি মনিরুল হক জমাদ্দারের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। অধ্যক্ষ আব্দুল্লাহ মাহমুদ জানান, সভাপতি বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তবে তার মুঠোফোন নম্বর চাইলে সেটি তার কাছে নেই বলে জানান তিনি। স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারি বরাদ্দের প্রকৃত সুবিধাভোগীর সংখ্যা যাচাই, অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত এবং প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তদন্তে কোনো ধরনের অনিয়ম, ভুয়া তথ্য বা জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংরক্ষণেরও দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে পিরোজপুর জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ইব্রাহিম খলিল বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি আগে অবগত ছিলাম না। গত ১২ জুলাই অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। অভিযোগ পাওয়ার পর ভান্ডারিয়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এতিম ও দুস্থদের হক কোনোভাবেই আত্মসাৎ হতে দেওয়া হবে না। তদন্তে কোনো ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিধি মোতাবেক সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, প্রকৃত সুবিধাভোগীর সংখ্যা, সরকারি বরাদ্দের অর্থের ব্যবহার এবং এতিমখানার সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে উদঘাটন করা হবে।
মন্তব্য করুন