‘নয়ি জিন্দেগী’ সিনেমা দিয়ে শিশুশিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা অভিনেতা ও ফাইট ডিরেক্টর সিরাজ উদ্দিন রতন ভালো নেই। প্রায় চার’শ সিনেমায় অভিনয় করা এই অভিনেতা সম্প্রতি হার্ট অ্যাটাক করে চিকিৎসাধীন রয়েছে। গত ২২ জুলাই তিনি হার্ট অ্যাটাক করেছেন বলে নিশ্চিত করেছেন রতন। অসুস্থ অবস্থায় সিনেমার কেউ খোঁজ না নিলেও চিত্রনায়িকা রঞ্জিতা ও রুমানা ইসলাম মুক্তি নিয়মিত খোঁজ রাখছেন তার। সেইসঙ্গে আনোয়ারা কন্যা মুক্তি রতনের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন বলে এই অভিনেতা জানান।
তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আগের থেকে এখন কিছুটা সুস্থ অনুভব করছি। এই খারাপ সময়ে আমার পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়েছে চিত্রনায়িকা মুক্তি। নিয়মিত খোঁজ খবর রাখা ও আমার চিকিৎসার সম্পূর্ণ খরচ বহন করছে। রঞ্জিতা সহযোগিতা করতে না পারলেও খোঁজ রাখছে। তবে আমার অসুস্থতার খবরে চলচ্চিত্রের আর কোনো মানুষ খোঁজ নেয়নি। অথচ আমি প্রায় ৪০০ সিনেমায় কাজ করেছি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে এত মানুষের সাথে কাজ করেছি কিন্তু কেউ খোঁজও নেয়নি। গুটি কয়েক মানুষ ছাড়া চলচ্চিত্রের অধিকাংশই স্বার্থপর। খুব কষ্টে আজ কথাগুলো বলতে হলো।
এই অভিনেতা আরও বলেন, ‘মুক্তি এমন একটা মেয়ে যার প্রশংসা না করলে নয়। সে সব শিল্পদের বিপদে সবার আগে থাকে। চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার পাশাপাশি নিয়মিত খোঁজ রাখে। ওর মা আনোয়ারা আপাও ঠিক একই কাজ করতেন। মুক্তির মতো ভালো মেয়ে এই ইন্ডাস্ট্রিতে কমই আছে। সবাই আমার ও মুক্তির জন্য দোয়া করবেন।’
এদিকে, কয়েক দিন আগে হঠাৎ করেই তীব্র বুকে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ফাইটার রতন। চিকিৎসকরা জানান, তিনি ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকের শিকার হয়েছেন এবং তার জরুরি উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, পর্দার পেছনের এই কর্মীদের অর্থনৈতিক অবস্থা বরাবরই অনিশ্চিত থাকে। রতনের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। হঠাৎ এই চিকিৎসার বিশাল খরচের বোঝা বহন করা তার পরিবারের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে। একদিকে হাসপাতালের আইসিইউর ক্রমবর্ধমান বিল, অন্যদিকে ওষুধের খরচ- সব মিলিয়ে এক চরম দিশেহারা পরিস্থিতির মুখোমুখি হয় রতনের পরিবার।
নব্বই দশকের তুমুল জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা রুমানা ইসলাম মুক্তি দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্র অঙ্গনের অসচ্ছল ও অসহায় সহকর্মীদের পাশে নানা মানবিক কাজে যুক্ত রয়েছেন। করোনা মহামারি, বন্যার সময়, শীত মৌসুম, ঈদসহ নানা সংকটের সময় নিয়মিত তিনি নানা সামাজিক ও কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। যোগাযোগ করা হলে রতনের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন জানিয়ে মুক্তি বলেন, ‘আমাদের জীবনটা শুধু নিজেদের জন্য নয়, আমাদের চারপাশে যারা আছেন, তাদের প্রতিও আমাদের কিছু দায়বদ্ধতা থাকে। আমি সবসময় বিশ্বাস করি, সৃষ্টিকর্তা আমাদের যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তা কেবল নিজেদের সুন্দরভাবে রাখার জন্য নয়, বরং বিপদে অন্য মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। চলচ্চিত্র শিল্প আমার পরিবার। এখানে ক্যামেরার সামনে যেমন আমরা কাজ করি, ক্যামেরার পেছনেও শত শত মানুষ দিনরাত পরিশ্রম করে একটি সিনেমা সফল করে তোলেন। ফাইটার রতন মামাসহ ইন্ডাস্ট্রির যেকোনো সহযোদ্ধা যখনই কোনো সংকটে পড়েন, তখন তাদের পাশে থাকাটা আমি আমার দায়িত্ব মনে করি। এটা কোনো দয়া বা করুণা নয়, এটা পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে অন্য সদস্যের প্রতি কর্তব্য। শুধু চলচ্চিত্রের মানুষই নন, দেশের যেকোনো দুর্যোগে, বিশেষ করে বন্যার মতো কঠিন সময়ে যখন আমাদের সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে পড়েন, তখন ঘরে বসে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। মানুষের চোখের জল আর অসহায়ত্ব আমাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। আমি সবসময় চেষ্টা করি আমার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে তাদের মুখে একটু হাসি ফোটাতে।
মুক্তি আরও বলেন, ‘আমি মনে করি, শিল্পী পরিচয়ের চেয়ে একজন ভালো মানুষ হওয়াটা অনেক বেশি জরুরি। আজ আমি যে অবস্থানে এসেছি, তা এই দেশের সাধারণ মানুষ এবং আমার ইন্ডাস্ট্রির সবার ভালোবাসার কারণেই সম্ভব হয়েছে। তাই মানুষের বিপদে এগিয়ে আসা আমার নৈতিক দায়িত্ব। আমরা যদি প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে একে অপরের হাত ধরি, তবে যেকোনো দুর্যোগ বা কঠিন পরিস্থিতি জয় করা সম্ভব। আপনাদের এই ভালোবাসা আর দোয়া যেন সবসময় আমার সাথে থাকে, যাতে আমৃত্যু মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারি।
বলা দরকার, রতন অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে- চোর, দাপট, নরম গরম, আপোষ, বিধাতা, আঞ্জুমান, সন্দী, মর্জিনা, গার্মেন্টস শ্রমিক জিন্দাবাদ, আমি ডন, রাজকপাল, আলতা বানু ইত্যাদি।
মন্তব্য করুন