১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমায় যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা হামলা আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে এক বড় অধ্যায়। ওই হামলার ৮১ বছর পূর্তিতে আবারও পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা, নিরস্ত্রীকরণ ও বিশ্ব নিরাপত্তা সামনে এসেছে।
হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে হামলাই এখন পর্যন্ত যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের একমাত্র ঘটনা। এসব হামলা শুধু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিই ঘটায়নি; বরং বিশ্বকে পারমাণবিক যুগে প্রবেশ করায়।
হিরোশিমায় কী ঘটেছিল?
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২৯ বোমারু বিমান ‘এনোলা গে’ জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর ‘লিটল বয়’ নামের পারমাণবিক বোমা ফেলে।
তখন শহরটিতে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ বাস করতেন। বিস্ফোরণের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই শহরের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায়। তীব্র তাপ, বিস্ফোরণের চাপ ও বিকিরণের কারণে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে।
ধারণা করা হয়, ১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ হিরোশিমায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হন।
নাগাসাকিতে দ্বিতীয় হামলা
হিরোশিমার তিন দিন পর, ৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র জাপানের নাগাসাকি শহরে দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’ নিক্ষেপ করে।
নাগাসাকি ছিল গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও শিল্পনগরী। শহরের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা সীমিত হলেও হামলার ধ্বংসযজ্ঞ ছিল ভয়াবহ।
১৯৪৫ সালের শেষ নাগাদ সেখানে প্রায় ৭৪ হাজার মানুষ নিহত হন।
যুক্তরাষ্ট্র কেন পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করেছিল?
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, জাপানকে দ্রুত আত্মসমর্পণে বাধ্য করা এবং দীর্ঘস্থায়ী স্থলযুদ্ধ এড়ানোর জন্য এই হামলা চালানো হয়।
তবে সমালোচকদের মতে, তখন জাপান অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং বেসামরিক মানুষের ওপর এমন ভয়াবহ হামলা এড়ানোর অন্য পথ ছিল।
পারমাণবিক হামলা প্রয়োজনীয় ছিল কি না—এ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে এখনো বিতর্ক রয়েছে।
পারমাণবিক বোমা কেন আলাদা?
সাধারণ বোমার চেয়ে পারমাণবিক অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা অনেক বেশি। পরমাণুর বিভাজন থেকে তৈরি শক্তির কারণে এসব অস্ত্র এক মুহূর্তে একটি পুরো শহর ধ্বংস করতে পারে।
হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মানুষ বিস্ফোরণ, প্রচণ্ড তাপ, আগুন ও বিকিরণের কারণে মারা যায়। অনেক জীবিত মানুষ পরবর্তী বছরগুলোতে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা ও মানসিক আঘাতের সঙ্গে লড়াই করেছেন।
হিবাকুশা কারা?
জাপানি ভাষায় পারমাণবিক হামলার জীবিতদের বলা হয় ‘হিবাকুশা’।
তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিশ্বকে পারমাণবিক অস্ত্রের ভয়াবহতা সম্পর্কে সতর্ক করে আসছেন। তাদের প্রচেষ্টাই বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে কী পরিবর্তন এনেছিল?
হিরোশিমা ও নাগাসাকি হামলার মাধ্যমে শুরু হয় পারমাণবিক যুগ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র ছিল। পরে ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়। এরপর যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীনসহ আরও কয়েকটি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে।
এর ফলে শুরু হয় পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ বেড়ে যায়।
একই সঙ্গে পারমাণবিক হামলার ভয় থেকেই অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও নিরস্ত্রীকরণের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বর্তমানেও কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের ঝুঁকি আবারও আলোচনায় এসেছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে সংঘাত, দুর্বল হয়ে পড়া অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি এবং পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর উত্তেজনা নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশগুলো এগুলোকে নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বলে দাবি করে। অন্যদিকে, নিরস্ত্রীকরণপন্থিরা মনে করেন, হিরোশিমা ও নাগাসাকি প্রমাণ করেছে—পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার মানবজাতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। তখন থেকেই
মন্তব্য করুন