ক্রাইম এক্সপ্রের্স
১০ জুলাই ২০২৬, ১২:২৮ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

বাগেরহাটে ১১ বছর ধরে দরজার দিকে চেয়ে আছেন মা

প্রতিদিনের মতো ঘরের কোণে রাখা একটি ছবির সামনে কিছুক্ষণ নীরবে বসে থাকেন রোকেয়া বেগম। ছবিটি তার বড় ছেলে নিয়ামুল হোসেনের। তারপর ধীরে ধীরে চোখ যায় ঘরের দরজার দিকে। হয়তো আজ, হয়তো কাল—একদিন ছেলে ফিরে এসে ডাকবে, “মা, আমি এসেছি।” এই আশাতেই কেটে গেছে এক যুগের কাছাকাছি সময়। কিন্তু অপেক্ষার অবসান হয়নি। বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার বগা জেলে পল্লীর বাসিন্দা রোকেয়া বেগম (৬৫) ও তার স্বামী শুকুর আলীর (৭০) জীবনের সবচেয়ে বড় বেদনার নাম নিয়ামুল হোসেন। ২০১৫ সালে জীবিকার তাগিদে অন্য জেলেদের সঙ্গে গভীর সাগরে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন তিনি। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ২৪ বছর। কিন্তু সেই যাত্রা আর শেষ হয়নি। তার সঙ্গে থাকা অন্যরা ফিরে এলেও নিয়ামুল আর ঘরে ফেরেননি। পরিবার ও স্থানীয়রা জানান, সাগরে বৈরী আবহাওয়া ও ঝড়ো পরিস্থিতির মধ্যে কোথাও হারিয়ে যান তিনি। এরপর বহু খোঁজাখুঁজি, অনুসন্ধান ও অপেক্ষার পরও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। কিন্তু মায়ের বিশ্বাস এখনও অটুট—তার ছেলে একদিন ফিরে আসবে। নিয়ামুলের ছোট ভাই বাশার বলেন,ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তাদের পরিবারের জীবন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বহু জায়গায় খোঁজ করেও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, তাদের মা এখনও প্রতিটি শব্দে চমকে ওঠেন। দরজায় সামান্য আওয়াজ হলেই মনে করেন নিয়ামুল ফিরে এসেছে। সেই অপেক্ষা আর কান্না পুরো পরিবারকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দেয়। বৃদ্ধ বাবা শুকুর আলী বলেন, ছেলেকে হারানোর শোক কখনও কমেনি। বয়সের ভারে এখন আর কাজ করার শক্তিও নেই। সংসারের অভাবের সঙ্গে যোগ হয়েছে ছেলেকে হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার একটাই আকাঙ্ক্ষা মৃত্যুর আগে অন্তত ছেলের কোনো খোঁজ জানতে পারা। রোকেয়া বেগমের কণ্ঠে এখনও আশার সুর। তিনি বলেন,১১ বছর হয়ে গেছে, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমার ছেলে কোথাও না কোথাও বেঁচে আছে। প্রতিদিন তার জন্য অপেক্ষা করি। আল্লাহর কাছে শুধু দোয়া করি, মৃত্যুর আগে যেন একবার তাকে দেখতে পারি। স্থানীয় বাসিন্দা একলাস হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটি চরম কষ্টের মধ্যে জীবনযাপন করছে। বৃদ্ধ বাবা-মা এখনও ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছেন। মানবিক কারণে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ছোট ছেলের সীমিত আয়েই কোনো রকমে সংসার চলছে। একটি ছোট ঘরে বসবাস করছেন বৃদ্ধ দম্পতি। নিয়ামুল নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘ ১১ বছর পার হলেও তারা কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা বা পুনর্বাসন সুবিধা পাননি বলে অভিযোগ করেন। এ বিষয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ বাতেন বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো আবেদন এখনো পাওয়া যায়নি। আবেদন পেলে বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে। উপকূলীয় অঞ্চলের অসংখ্য জেলে পরিবারের মতো নিয়ামুলের পরিবারও আজ অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষার এক দীর্ঘ অধ্যায়ের মধ্যে বন্দি। সাগরে হারিয়ে যাওয়া একজন সন্তানের ফিরে আসার আশায় দিন গুনছেন বৃদ্ধ মা-বাবা। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেলেও তাদের চোখের সেই প্রতীক্ষা আজও ফুরায়নি।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হামের উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ১ হাজারের বেশি

এনআইডি সংশোধনসহ বিভিন্ন সেবার ফি পুনর্নির্ধারণ

বন্ধ কারখানা চালু ও বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

স্কুলে যাওয়ার পথে বাসচাপায় প্রাণ গেল শিক্ষকের

দুই স্ত্রীর যৌতুক মামলা, ডিএমপির কনস্টেবল কারাগারে

ঢাকাসহ ৯ জেলায় দুপুরের মধ্যে বজ্রবৃষ্টির আভাস

অভিনেতা রতনের চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেন মুক্তি

চিরিরবন্দরে কৃষকলীগ সভাপতির বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ

নেতি আর ইতি

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সুযোগ রাখতে ইসির সঙ্গে বৈঠকে জামায়াত

১০

জিয়াউর রহমান হত্যা তদন্ত কমিশনের অপ্রকাশিত প্রতিবেদনে কী আছে

১১

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তারিখ ঠিক হয়নি, তবে প্রস্তুত নির্বাচন কমিশন : সিইসি

১২

বঙ্গভবনে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু করলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি

১৩

গুলশানে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় থামছে না রত্না ও বাহারের স্পা সিন্ডিকেট

১৪

ইরানে হামলা বন্ধের ‘আসল কারণ’ জানালেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত

১৫

সজীব ওয়াজেদ জয়ের ৫৬তম জন্মদিন আজ

১৬

ঢালাইয়ের পরই সেতুর পাটাতনে ধস, তদন্তে ২ কমিটি

১৭

চিরিরবন্দরে গ্রামীণ সড়কের কোর রোড নেটওয়ার্ক ও তথ্য যাচাই বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত

১৮

ভান্ডারিয়ার এতিমখানায় সরকারি বরাদ্দ নিয়ে প্রশ্ন, সুবিধাভোগীর সংখ্যা নিয়ে অসঙ্গতির অভিযোগ

১৯

দেশে অস্থিরতা, লন্ডনে ফুরফুরে ‘কিং’ শাহরুখ

২০