চট্টগ্রামের আলোচিত জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও অপশক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যারা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে। কোনো সন্ত্রাসী কিংবা চাঁদাবাজের জায়গা জঙ্গল সলিমপুরে হবে না।
মঙ্গলবার (০৪ আগস্ট) বিকেলে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমি যেহেতু নতুন যোগদান করেছি, তাই এই এলাকা ও আশপাশের সার্বিক পরিস্থিতি বুঝতে এসেছি। এখানে আমাদের ফোর্সের ডেপ্লয়মেন্ট কেমন আছে, ডিউটি কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সুযোগ-সুবিধা ও সমস্যাগুলো কী এসব দেখার পাশাপাশি এলাকার কৌশলগত বিষয়গুলো পর্যালোচনা করছি।’
ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী বলেন,‘পরবর্তী কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করাই আমার এই পরিদর্শনের উদ্দেশ্য।’
জঙ্গল সলিমপুরে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইজি বলেন, ‘ক্যাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা আছে। এটি ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হবে। এ বিষয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি।’
পাহাড়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রের বিপক্ষে যে অপশক্তি চ্যালেঞ্জ দেবে, তাদের জন্য আমাদের অবস্থান পরিষ্কার- জিরো টলারেন্স। এটি আমরা বজায় রাখব। এর কিছু নমুনা আপনারা ইতোমধ্যে দেখেছেন, এটি অব্যাহত থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো সন্ত্রাসী, কোনো চাঁদাবাজের জায়গা এখানে হবে না। আমাদের কিছু কৌশলগত অসুবিধা রয়েছে। তবে আশা করছি, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই- মাস দুয়েকের মধ্যে এলাকাটি সম্পূর্ণভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারব। এখানে কোনো সন্ত্রাসী বাহিনী কিংবা গুণ্ডাবাহিনী থাকবে না।’
এর আগে বিকেল ৩টার দিকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল পুলিশ ক্যাম্প ও আলিনগর পুলিশ ক্যাম্প পরিদর্শন করেন।
পরে পরিদর্শনের অংশ হিসেবে ছিন্নমূল ৩ ও ৪ নম্বর সমাজের উদ্যোগে ছিন্নমূল লটকন শাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্থানীয়দের সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ সময় চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলমসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রসঙ্গত, চট্টগ্রামের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়কের পাশে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর মূলত ছিন্নমূল ও আলীনগর- এই দুই অংশ নিয়ে গঠিত। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এলাকাটিতে রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমি। দীর্ঘদিন ধরে ভূমিদস্যু, সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণে থাকার অভিযোগ রয়েছে এলাকাটিকে ঘিরে। পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন, ভূমি দখল, চাঁদাবাজি ও অপরাধ কর্মকাণ্ডের কারণে একসময় জঙ্গল সলিমপুর ছিল আতঙ্কের নাম।
গত ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। এ ঘটনার পর ৯ মার্চ অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও এপিবিএনের সমন্বয়ে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করা হয়।
পরে সেখানে যৌথবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। তবে ২৪ মে রাতে জঙ্গল সলিমপুরে স্থাপিত যৌথবাহিনীর একটি ক্যাম্পে সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, হামলাকারীরা নির্মাণাধীন একটি ক্যাম্প ক্ষতিগ্রস্ত করে এলাকায় আতঙ্ক সৃষ্টি করে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এর ধারাবাহিকতায় ৩১ মে জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মো. হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী ও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির।
বর্তমানে প্রশাসনের ধারাবাহিক তৎপরতা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এবং স্থানীয়দের সহযোগিতায় জঙ্গল সলিমপুরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরছে। নতুন নিরাপত্তা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘদিনের আতঙ্কের পরিচয় পেছনে ফেলে শান্তি ও নিরাপত্তার জনপদ হিসেবে গড়ে উঠবে এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর এটি আবদুল কুদ্দুস চৌধুরীর জঙ্গল সলিমপুরে প্রথম পরিদর্শন। এর আগে তিনি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। জুলাই ২০২৬ সালের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি হিসেবে পদায়ন করা হয়।
মন্তব্য করুন