ক্রাইম এক্সপ্রের্স
৭ জুলাই ২০২৬, ৭:৩৮ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারের ১০ উপজেলা প্লাবিত, পাহাড়ধসে আরও একজনের মৃত্যু

টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানিতে কক্সবাজারের ১০টি উপজেলার অন্তত ২৫টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি ও সড়কে পানি ওঠায় হাজারো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। দুর্যোগের মধ্যে মঙ্গলবার কক্সবাজার সদর উপজেলার দরিয়ানগর এলাকায় পাহাড়ধসে নাছিমা আক্তার (৩৫) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত তিন দিনে জেলায় পাহাড়ধসে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ১১ জনে দাঁড়িয়েছে।

টানা বৈরী আবহাওয়ার কারণে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে টানা পাঁচ দিন ধরে যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে সেন্টমার্টিনে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে দ্বীপে যেতে না পেরে টেকনাফে আটকা পড়েছেন শতাধিক যাত্রী।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, টেকনাফ পৌরসভা এবং সদর, সাবরাং, হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের অন্তত ৮০০ পরিবারের ঘরবাড়িতে পানি ঢুকেছে। একই সঙ্গে লেদা, জাদিমুড়া ও আলীখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের প্রায় ৭০০টি আশ্রয়ঘরও প্লাবিত হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার।

মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ে। তবে সর্বশেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত উপজেলায় নতুন করে প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।

টেকনাফ সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা আমিন হোসেন বলেন, ‘বাড়িতে পানি ঢুকে সবকিছু তলিয়ে গেছে। সকাল থেকে শুধু মুড়ি-চানাচুর খেয়ে আছি। আশপাশের অনেক পরিবারের একই অবস্থা। খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নামছে না।’

হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. আলী বলেন, ভারী বৃষ্টিতে ইউনিয়নের অন্তত ৪০০টি ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক। শতাধিক কাঁচা ঘর আংশিক বা পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে।

সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা মো. জয়নাল আবেদিন বলেন, কয়েকদিন ধরে নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় টেকনাফ থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে অনেক পণ্যের দাম বেড়েছে এবং সংকটও দেখা দিয়েছে।

দ্বীপের আরেক বাসিন্দা নুরুল আলম জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়েক দিন ধরে টেকনাফে আটকা আছেন। পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলাম বলেন, টানা পাঁচ দিন ধরে দ্বীপের সঙ্গে টেকনাফের নৌযোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষণ নেই। এতে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, ভারী বৃষ্টিতে বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। দ্বীপের পরিস্থিতিও সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

এদিকে রামু উপজেলার গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া ও কাউয়ারখোপ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, ঈদগাঁও ও কক্সবাজার সদর উপজেলার বিভিন্ন নিচু এলাকাও পানিতে তলিয়ে গেছে। কক্সবাজার পৌরসভার হোটেল-মোটেল জোন, কলাতলী, সুগন্ধা, বাজারঘাটা, কালুর দোকান, তারাবনিয়াছড়া, বাস টার্মিনাল ও বিজিবি ক্যাম্পসংলগ্ন সড়কে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের দুর্ভোগ বেড়েছে।

পেকুয়ার টৈটং ইউনিয়নের হাজীবাজার মসজিদসংলগ্ন এলাকায় একটি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে পড়ায় পুরো এলাকা বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে জনজীবন ও যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।

পাহাড়ধসে আরও এক প্রাণহানি
মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজার সদর উপজেলার দরিয়ানগর এলাকায় পাহাড়ধসে নাছিমা আক্তারের মৃত্যু হয়। এসময় তার স্বামী জসিম উদ্দিন ও পরিবারের এক শিশু সদস্য আহত হয়।

নিহতের ভাই মনির হোসেন বলেন, পাহাড়ের পাদদেশে তাদের বসতঘর ছিল। টানা বৃষ্টির মধ্যে হঠাৎ পাহাড়ের মাটি ধসে ঘরের ওপর পড়ে। আহত তিনজনকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক নাছিমাকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত জসিম উদ্দিনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

এর আগে রোববার ও সোমবার উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসে নারী-শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যু হয়।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) জানিয়েছে, ৪ থেকে ৭ জুলাইয়ের মধ্যে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১০ জন নিহত এবং ১০ জন আহত হয়েছেন। এতে ১৫ হাজার ৮১৩ জন ক্ষতিগ্রস্ত ও ৩ হাজার ১৮২ জন বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ হাজার ৬২৪টি আশ্রয়। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকির সতর্কতা দিয়েছে সংস্থাটি।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে কক্সবাজারসহ উপকূলীয় এলাকায় ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। আগামী তিন দিনও এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে।

জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে নিয়ে জরুরি সভা করা হয়েছে। পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে প্রশাসন কাজ করছে। নির্দেশনা অমান্য করে কেউ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মেসির গোলে সমতায় আর্জেন্টিনা

মেসির জাদুতে সমতায় আর্জেন্টিনা

জামায়াত আমিরের সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাত

টানা বৃষ্টিতে কক্সবাজারের ১০ উপজেলা প্লাবিত, পাহাড়ধসে আরও একজনের মৃত্যু

বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হয়েছে: প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী

অর্থনীতির গতি বাড়াতে বীমা খাতকে আইনি কাঠামোয় আনার তাগিদ তথ্যমন্ত্রীর

যাচাই-বাছাই করে রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার করা হচ্ছে : আইনমন্ত্রী

চিরিরবন্দরে নদীতে গোসলে নেমে এইচএসসি পরীক্ষার্থীর মৃত্যু

ফুলবাড়ীতে নালার পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু

ফুলবাড়ীতে মাদক বিরোধী সমাবেশে ডঃ আতিক মুজাহিদ এমপি

১০

বাজেট ব্যবসাবন্ধব, বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আদায়: বিপিজিএমইএ

১১

এনসিপির সমাবেশস্থলে ককটেল বিস্ফোরণ, আহত ২

১২

সমস্যা থাকবেই, বসে থাকলে চলবে না: প্রধানমন্ত্রী

১৩

বিশ্বকাপের মাঝেই মেসির বউকে বিশেষ উপহার পাঠালেন রোনালদোর বান্ধবী

১৪

সরকার গণভোট ও জুলাই সনদকে এখন অস্বীকার করছে: নাহিদ ইসলাম

১৫

শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা জোরদার

১৬

গোবিন্দগঞ্জে হরিপুর শহরভানিয়া দাখিল মাদ্রাসা: বহুতল ভবনের দাবি

১৭

পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশের চূড়ান্ত সময় নির্ধারণ, কার বেতন কত

১৮

বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েও ৩৬৭ কোটি টাকা পাচ্ছে ব্রাজিল

১৯

দুর্ভোগ পিছু ছাড়ছে না যাতায়াতকারীদের

২০