কানাডার লেক লুইজে মেরিলিন মনরো থেকে হৃতিক রোশনের সিনেমার স্মৃতি
কানাডার রকি পর্বতমালার কোলে অবস্থিত লেক লুইজ শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই বিখ্যাত নয়, হলিউড ও বলিউডের বহু সিনেমার স্মৃতিও জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের সঙ্গে। মেরিলিন মনরো থেকে আলফ্রেড হিচকক এবং হৃতিক রোশন থেকে প্রীতি জিনতা বিনোদনজগতের তারকাদের নানা গল্পে সমৃদ্ধ কানাডার এই জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য। কানাডার আলবার্টা প্রদেশের ব্যানফ ন্যাশনাল পার্কে অবস্থিত লেক লুইজের চারপাশে রয়েছে বরফঢাকা পাহাড়, স্বচ্ছ পানির হ্রদ, ঘন বন ও ভিক্টোরিয়া হিমবাহ। ক্যালগারি থেকে গাড়িতে প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার পথ পেরিয়ে পৌঁছানো যায় এই মনোরম স্থানে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের পাশাপাশি ঐতিহাসিক ফেয়ারমন্ট শাতো লেক লুইজ হোটেলও পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। এই হোটেলের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৮৯০ সালে। কানাডিয়ান প্যাসিফিক রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক কর্নেলিয়াস ভ্যান হর্ন এখানে একটি ছোট কাঠের শ্যালে নির্মাণ করেন। শুরুতে ছিল খাবারের জায়গা, একটি বার ও দুটি শোবার ঘর। সময়ের সঙ্গে সম্প্রসারণ, অগ্নিকাণ্ড ও পুনর্নির্মাণের মধ্য দিয়ে ছোট স্থাপনাটি রূপ নেয় বর্তমানের বিশাল ঐতিহাসিক হোটেলে। লেক লুইজের সিনেমার ইতিহাসও প্রায় এক শতাব্দী পুরোনো।আড়ও পড়ুন,মুক্তির অপেক্ষায় দীঘির ‘বিদায়’ কবে ফিরবেন চেনা ছন্দে ১৯২৯ সালে মুক্তি পাওয়া আর্নস্ট লুবিচ পরিচালিত নির্বাক চলচ্চিত্র ‘ইটারনাল লাভ’-এর সঙ্গে কানাডিয়ান রকিজের এই অঞ্চলের যোগ রয়েছে। জন ব্যারিমোর ও ক্যামিলা হর্ন অভিনীত ছবিটির গল্পের পটভূমি ছিল সুইস আল্পস। সেই পাহাড়ি পরিবেশ ফুটিয়ে তুলতে ব্যবহার করা হয়েছিল কানাডার রকিজের প্রাকৃতিক দৃশ্য। ১৯৫৩ সালে হলিউড অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো ‘রিভার অব নো রিটার্ন’ সিনেমার শুটিং করতে কানাডিয়ান রকিজে আসেন। রবার্ট মিচামের সঙ্গে অভিনীত ছবিটি পরিচালনা করেন অটো প্রিমিঞ্জার। ১৯৫৪ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমার দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল ব্যানফ ও জ্যাসপার ন্যাশনাল পার্কসহ রকিজের বিভিন্ন এলাকায়। শুটিংয়ের সময় গোড়ালিতে আঘাত পাওয়ায় কয়েক দিন কাজ থেকেও বিরত থাকতে হয়েছিল মনরোকে। ঐতিহাসিক ফেয়ারমন্ট শাতো লেক লুইজ হোটেলের বিখ্যাত অতিথিদের তালিকায় আরও রয়েছেন আলফ্রেড হিচকক, মেরি পিকফোর্ড, ডগলাস ফেয়ারব্যাংকস ও ক্রিস্টোফার রিভ। তবে তাঁদের সবাই যে সিনেমার শুটিংয়ের জন্য সেখানে গিয়েছিলেন, এমন নয়। বিশেষ করে হিচককের ক্ষেত্রে হোটেলে অতিথি হিসেবে থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও সেখানে তাঁর কোনো বিখ্যাত সিনেমার শুটিং হয়েছি এমন নির্ভরযোগ্য তথ্য মেলেনি। হলিউডের পাশাপাশি বলিউডের সিনেমাতেও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে কানাডার এই অঞ্চল। হৃতিক রোশন ও প্রীতি জিনতা অভিনীত ২০০৩ সালের জনপ্রিয় সিনেমা ‘কোই...মিল গায়া’র বেশ কিছু দৃশ্য ও গানের শুটিং হয়েছিল কানাডিয়ান রকিজের বিস্তীর্ণ এলাকায়। সিনেমাটির ‘হায়লা হায়লা হুয়া হুয়া’ গানেও পাহাড়, হ্রদ ও প্রাকৃতিক প্রান্তরের দৃশ্য দেখা যায়।আড়ও পড়ুন,মাসুমা রহমান নাবিলার সঞ্চালনায় আসছে ‘লং ড্রাইভ এ ছাড়া ২০০১ সালে মুক্তি পাওয়া অনুভব সিনহা পরিচালিত ‘তুম বিন’ সিনেমার বড় অংশের শুটিং হয়েছিল ক্যালগারিতে। ২০০৬ সালের ‘হামকো দিওয়ানা কার গায়ে’ সিনেমার দৃশ্য ধারণ করা হয় ক্যালগারি, ড্রামহেলার ও এডমন্টনে। অক্ষয় কুমার অভিনীত ২০০৯ সালের ‘এইট বাই টেন তাসভির’ সিনেমার শুটিংও হয়েছিল ক্যালগারিতে। একই অঞ্চলে হ্রদ, হিমবাহ, বরফঢাকা পাহাড়, বন ও উপত্যকার বৈচিত্র্য সিনেমা নির্মাতাদের আকৃষ্ট করেছে দীর্ঘদিন ধরে। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় প্রকৃতির রং ও দৃশ্যপট। ফলে একই ভূদৃশ্যকে কখনো কানাডা, কখনো ইউরোপের পাহাড়ি অঞ্চল হিসেবে পর্দায় তুলে ধরা সম্ভব হয়। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগ থেকে আধুনিক ডিজিটাল সিনেমা—সময়ের সঙ্গে বদলেছে চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রযুক্তি। বদলেছে লেক লুইজের তীরের স্থাপনাও। কিন্তু রকি পর্বতমালা, হ্রদ ও হিমবাহের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এখনো পর্যটক ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের আকর্ষণ করে চলেছে। তাই লেক লুইজ শুধু ভ্রমণের গন্তব্য নয়, হলিউড ও বলিউডের সিনেমার ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে থাকা এক বিশেষ স্থান।