রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩ ঢাকা   
ক্রাইম এক্সপ্রেস
Topic Ads 1
আউশ চাষে বদলে যাচ্ছে রংপুরের কৃষির চিত্র

আউশ চাষে বদলে যাচ্ছে রংপুরের কৃষির চিত্র

একসময় বোরো ধান ঘরে তোলার পর আমন চাষ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত রংপুরের কৃষিতে নেমে আসত স্থবিরতা। জমির বড় একটি অংশ পড়ে থাকত অনাবাদি। কাজের অপেক্ষায় থাকতে হতো কৃষিশ্রমিকদের। কৃষিনির্ভর অনেক পরিবারকে পার করতে হতো অভাব-অনটনের সময়। সেই বাস্তবতার সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল ‘মঙ্গা’ শব্দটি।তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময় এখন আর পুরোপুরি ফাঁকা থাকছে না। আউশসহ বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি ও মৌসুমি ফসলের আবাদে জমি যেমন উৎপাদনের আওতায় আসছে তেমনি বাড়ছে কৃষক ও কৃষিশ্রমিকের কাজের সুযোগ।রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলায় বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময় কাজে লাগানোর গুরুত্বপূর্ণ ফসল হয়ে উঠেছে আউশ। কৃষকের আগ্রহ ও চাষের বিস্তারে গত কয়েক বছরে এ অঞ্চলে আউশের আবাদ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে রংপুর অঞ্চলে আউশের আবাদ হয়েছিল ২৪ হাজার ৯৮৮ হেক্টর জমিতে। হেক্টরপ্রতি ফলন ছিল ২ দশমিক ৯৮ মেট্রিক টন এবং মোট উৎপাদন হয় ৭৩ হাজার ৬৫৬ মেট্রিক টন।২০১৮-১৯ অর্থবছরে আবাদ বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ হাজার ৬১৮ হেক্টরে। ওই বছর হেক্টরপ্রতি ফলন ছিল ৩ দশমিক ০৪ মেট্রিক টন এবং উৎপাদন হয় ১ লাখ ২৩ হাজার ৪৭৮ মেট্রিক টন।২০১৯-২০ অর্থবছরে আউশের আবাদ হয় ৪৭ হাজার ৭৭৬ হেক্টর জমিতে। হেক্টরপ্রতি ফলন ছিল ৩ দশমিক ১৪ মেট্রিক টন এবং মোট উৎপাদন দাঁড়ায় ১ লাখ ৫০ হাজার ১৬ মেট্রিক টন।আড়ও পড়ুন,ভাইরাল অডিওতে বিতর্কিত বক্তব্য, ওসি প্রত্যাহার২০২০-২১ অর্থবছরে আবাদ আরও বেড়ে হয় ৬০ হাজার ২৮০ হেক্টর। ওই বছর হেক্টরপ্রতি ফলন ছিল ৩ দশমিক ১০ মেট্রিক টন এবং মোট উৎপাদন হয় ১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৬৮ মেট্রিক টন।এরপর ২০২১-২২ সালে ৬২ হাজার ৯০ হেক্টর এবং ২০২২-২৩ সালে ৬৩ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে আউশ চাষ হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবাদ হয় ৬১ হাজার ৭৮২ হেক্টর জমিতে।২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬১ হাজার ১৫৭ হেক্টর জমিতে আউশ চাষ করে উৎপাদন হয় ১ লাখ ৮০ হাজার ২৬৮ মেট্রিক টন। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবাদ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১ হাজার ১৬৩ হেক্টরে। হেক্টরপ্রতি ফলন বেড়ে হয়েছে ৩ দশমিক ০২ মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরে মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭১২ মেট্রিক টন।অর্থাৎ গত ৯ বছরের ব্যবধানে রংপুর অঞ্চলে আউশের আবাদ বেড়েছে ৩৬ হাজার ১৭৫ হেক্টর। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আবাদ প্রায় ৬০ হাজার হেক্টরের ওপরেই রয়েছে। আবাদ বাড়ার পাশাপাশি উন্নত জাত ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে ফলনেও এসেছে পরিবর্তন।রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ব্রি-৪৮, ব্রি-৯৮, বিনা-২১, ধানী গোল্ড, গোল্ডেন-১ ও জনকরাজসহ অন্তত ৩০ ধরনের আউশ ধান চাষ হচ্ছে।গংগাচড়ার কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, একসময় বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়ে কাজের সংকট ছিল। এখন আউশসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ বেড়েছে। ফলে ওই সময়টাতেও জমিতে কৃষিকাজ হচ্ছে। বছরের কোনো সময়ই এখন আগের মতো বসে থাকতে হয় না।কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার বড়বাড়িগ্রামের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, বোরো কাটার পর জমি ফেলে না রেখে আউশ চাষ করা যায়। একই জমি থেকে বাড়তি আরেকটি ফসল পাওয়া যায়। খরচ ও পরিশ্রম তুলনামূলক কম হওয়ায় কৃষকরা আউশ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।তবে কৃষকদের হিসাবে আউশ চাষে লাভের পরিমাণ খুব বেশি নয়। এক একর জমিতে আউশ উৎপাদনে বীজ বীজতলা সার চারা সেচ কীটনাশক শ্রমিকের মজুরি ও মাড়াইসহ মোট খরচ প্রায় ৫২ হাজার ৫১২ টাকা। এক একরে উৎপাদন ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৩০ কেজি ধান। খড়ের মূল্য বাদ দিলে নিট উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৪৪ হাজার ৯১২ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি ধানের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ২৯ টাকা।কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি ধান ৩৪ টাকা দরে বিক্রি হলে একরপ্রতি মুনাফা থাকে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ টাকা।কৃষকরা বলছেন, সার বীজ কীটনাশক শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বাড়লে উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়। আবার ধান কাটার মৌসুমে বাজারদর কমে গেলে লাভ আরও কমে আসে। ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে আউশ চাষে কৃষকের আগ্রহ আরও বাড়বে।কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক পলাশ কান্তি নাগ বলেন, আউশের আবাদ বাড়াতে হলে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি উপকরণে ভর্তুকি বা প্রণোদনা এবং মানসম্মত বীজ ও সার সহজলভ্য করা গেলে কৃষকের আগ্রহ আরও বাড়বে।রংপুর আঞ্চলিক কৃষি অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, রংপুর অঞ্চলের কৃষিতে বড় পরিবর্তনের একটি দিক হলো বছরের মাঝের সময়টুকুও এখন আর আগের মতো অনাবাদি থাকছে না। আউশসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল সেই সময়কে উৎপাদনের আওতায় নিয়ে এসেছে। এতে জমির ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি কৃষিকাজের পরিধিও বিস্তৃত হয়েছে।তিনি বলেন, আউশ স্বল্পমেয়াদি ফসল হওয়ায় বোরো ও আমনের মধ্যবর্তী সময়ে এটি চাষ করা যায়। উন্নত জাত নির্বাচন সময়মতো চাষ সুষম সার প্রয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফলন আরও বাড়াতে কৃষকদের সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে।একসময় যে সময়টাকে রংপুরের কৃষিতে কাজের অভাব আর খাদ্যসংকটের সময় হিসেবে দেখা হতো এখন সেই সময়েই মাঠজুড়ে চলছে আবাদ। আউশসহ মৌসুমি ফসলের বিস্তারে জমির ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি কৃষিশ্রমিকদের কাজের সুযোগও তৈরি হয়েছে। ফলে রংপুরের কৃষিতে ‘মঙ্গা’ শব্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই পুরোনো বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে।