বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ ঢাকা   
ক্রাইম এক্সপ্রেস
Topic Ads 1
বাজারে চাল কিনতে গিয়ে বাড়তি খরচে ক্রেতারা

বাজারে চাল কিনতে গিয়ে বাড়তি খরচে ক্রেতারা

রাজধানীর বাজারে আবারও বেড়েছে চালের দাম। গত এক থেকে দেড় সপ্তাহে সরু চালের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মাঝারি মানের চালের দামও কেজিতে বেড়েছে প্রায় তিন টাকা। পাশাপাশি দেশি পেঁয়াজ রসুন ও খোলা সয়াবিন তেলের দামও বেড়েছে। অন্যদিকে ব্রয়লার মুরগি ও ডিম বিক্রি হচ্ছে আগের মতোই চড়া দামে। এতে নিত্যপণ্য কিনতে গিয়ে বাড়তি চাপের মুখে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, টাউন হল বাজার ও আগারগাঁও তালতলা বাজার ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বাজার ঘুরে দেখা যায়, ডায়মন্ড, মঞ্জুর ও সাগর ব্র্যান্ডের মিনিকেট চাল এখন প্রতি কেজি ৭৪ থেকে ৭৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে এসব চালের দাম ছিল ৭২ টাকা। রশিদ ব্র্যান্ডের মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৬৫ টাকা, যা এক থেকে দেড় সপ্তাহ আগে দুই টাকা কম ছিল। আর মোজাম্মেল ব্র্যান্ডের মিনিকেট চালের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৬ টাকা কেজি। সরু চালের মধ্যে নাজিরশাইলের দামও বেড়েছে। মানভেদে এ চাল বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৯৫ টাকা দরে। বিক্রেতাদের ভাষ্য, গত এক থেকে দেড় সপ্তাহে নাজিরশাইলের দাম কেজিতে দুই থেকে তিন টাকা বেড়েছে। মাঝারি মানের চালের দামও ঊর্ধ্বমুখী। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, পাইজাম, ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ চালের দাম এখন কেজিপ্রতি ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা। আরও পড়ুন,চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনায় চুক্তি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গেএক সপ্তাহের ব্যবধানে এসব চালের দাম কেজিতে প্রায় তিন টাকা বেড়েছে। তবে মোটা চালের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। বাজারে এ চাল বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে ধানের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন ব্যবসায়ীরা। নওগাঁর শিউলি অটোমেটিক রাইস মিলের মালিক আমিনুল ইসলাম জানান, সরু চালের মধ্যে কাটারি চালের ৫০ কেজির বস্তায় ৫০ টাকা দাম বেড়েছে। এতে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি কেজি চালের দাম বেড়েছে এক টাকা। ধানের দাম বৃদ্ধির কারণে এ মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানান তিনি। অন্যদিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় চাল পরিবহনে ট্রাকভাড়াও বেড়েছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের বরিশাল রাইস এজেন্সির ব্যবস্থাপক মো. মহিউদ্দিন বলেন, ধান সংগ্রহ থেকে শুরু করে পাইকারি বাজারে চাল পৌঁছানো পর্যন্ত কয়েক ধাপে ট্রাক ব্যবহার করতে হয়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর প্রতিবার ট্রাক ভাড়ায় দুই থেকে তিন হাজার টাকা বেশি খরচ হচ্ছে। এতে পাইকারি পর্যায়ে চালের দাম গড়ে কেজিতে প্রায় এক টাকা বেড়েছে।মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের খুচরা চাল বিক্রেতা মো. লোকমান হোসেন বলেন, একটি ট্রাকে প্রায় ১৫ হাজার কেজি চাল থাকে। প্রতি কেজিতে এক টাকা দাম বাড়লে পুরো চালের হিসাবে খরচ বাড়ে ১৫ হাজার টাকা। তাঁর মতে, শুধু ট্রাকভাড়া বৃদ্ধি নয়, বাজার তদারকির ঘাটতিও দামের ওপর প্রভাব ফেলছে।

ট্রাকভাড়া বাড়ায় ভোক্তার ওপর বাড়ছে খরচের চাপ

ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়তেই পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। দেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোল থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে এক ট্রিপের ট্রাকভাড়া বেড়েছে ৫ থেকে ৮ হাজার টাকা। কোনো কোনো রুটে এই বাড়তি খরচ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা লিটার হয়েছে। একই সময়ে কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা করা হয়েছে।জ্বালানির নতুন দামের পরপরই পণ্য পরিবহন খাতে ভাড়া নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন করে দর-কষাকষি। বেনাপোল থেকে ১৫ টন পণ্য ঢাকায় নিতে আগে ট্রাকভাড়া ছিল ২১ থেকে ২২ হাজার টাকা। এখন সেই ভাড়া বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকায়।চট্টগ্রাম রুটে আগে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হলেও এখন তা বেড়ে হয়েছে ৩৪ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। নারায়ণগঞ্জে ২২ থেকে ২৩ হাজার টাকা থেকে ভাড়া বেড়ে হয়েছে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ গন্তব্যভেদে প্রতিটি ট্রিপে বাড়তি খরচ হচ্ছে কয়েক হাজার টাকা। কিছু রুটে এই বৃদ্ধি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে।পরিবহন মালিকদের হিসাবে ট্রাক পরিচালন ব্যয়ের বড় একটি অংশই জ্বালানিনির্ভর। এর সঙ্গে রয়েছে টায়ার যন্ত্রাংশ রক্ষণাবেক্ষণ টোল ও ফেরির খরচ। আবার পণ্য নিয়ে গন্তব্যে যাওয়ার পর অনেক ট্রাককে খালি ফিরতে হয়। ফলে জ্বালানির বাড়তি দাম এবং খালি ফেরার খরচ মিলিয়ে পরিবহন ব্যয়ের ওপর চাপ আরও বাড়ছে।আড়ও পড়ুন,মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় তেলের বিকল্প উৎস আফ্রিকাবাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির এক নেতা জানিয়েছেন ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ ডিজেলনির্ভর। তাঁর মতে কিলোমিটার ও পণ্যের ওজনের ভিত্তিতে পণ্য পরিবহনের একটি নির্দিষ্ট ভাড়া কাঠামো থাকা প্রয়োজন। জ্বালানির দাম পরিবর্তনের সঙ্গে সেই কাঠামো অনুযায়ী ভাড়া সমন্বয়ের ব্যবস্থাও চান পরিবহন মালিকরা।এরই মধ্যে বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রাজধানীর কাঁচাবাজারে। কাওরান বাজারে গত এক সপ্তাহে পটোল ঢ্যাঁড়শ বেগুন ঝিঙা ধুন্দল ও করলাসহ কয়েক ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।ব্যবসায়ীরা বলছেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীতে কৃষিপণ্য আনার ক্ষেত্রে ট্রাক ও পিকআপের ওপর নির্ভর করতে হয়। পরিবহন খরচ বাড়লে সেই বাড়তি ব্যয় খেত থেকে আড়ত এরপর পাইকার এবং শেষ পর্যন্ত খুচরা পর্যায়ে যুক্ত হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাবের পর বাজারে তৈরি হচ্ছে দ্বিতীয় দফার চাপ।শুধু দেশীয় পণ্য নয় আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রেও বাড়ছে লজিস্টিক ব্যয়। চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে যুক্ত ২৩টি বেসরকারি আইসিডি ও অফডক পণ্য পরিবহন এবং কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কয়েকটি চার্জ প্রায় ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়েছে। ফলে বন্দর থেকে পণ্য বের হওয়ার আগেই পরিবহন ও হ্যান্ডলিং ব্যয়ের বাড়তি চাপ যুক্ত হচ্ছে।

ট্রাকভাড়া বাড়ায় ভোক্তার ওপর বাড়ছে খরচের চাপ

বাজারের ব্যাগে পণ্য কমছে খরচ বাড়ছেই

বাজারে পণ্যের তালিকা আগের মতোই থাকলেও খরচের হিসাব আর মিলছে না। তেল আটা-ময়দা মসলা সবজি থেকে শুরু করে মাছ মাংস ডিম ও দুধ—নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্যের বাড়তি দামে চাপে পড়েছে নির্দিষ্ট আয়ের পরিবারগুলো। কোনো কোনো পণ্যের দাম কিছুটা কমলেও অন্য পণ্যের বাড়তি দাম সেই স্বস্তি কেড়ে নিচ্ছে।মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে এবং ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের বাজারদর বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। বাজারের ব্যাগে একের পর এক প্রয়োজনীয় পণ্য ঢুকলেও মাসের বাজেট ঠিক রাখতে গিয়ে অনেক পরিবারকে এখন কেনাকাটার তালিকায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে।টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বাজারে খোলা আটা কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা এবং প্যাকেট আটা ৬০ থেকে ৭০ টাকা দরে। খোলা ময়দা ৭০ টাকা এবং প্যাকেট ময়দা ৮০ থেকে ৯০ টাকা। এক মাস আগে প্যাকেট ময়দার দাম ছিল ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা।ভোজ্য তেলের বাজারেও বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে ক্রেতাদের। এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২০৪ টাকা। দুই লিটার ৪১০ টাকা এবং পাঁচ লিটার বোতল ১ হাজার টাকা। এক বছর আগে এসব তেলের দাম ছিল তুলনামূলক কম। ফলে নিয়মিত রান্নার এই পণ্য কিনতেই পরিবারগুলোর বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে।মসলার বাজারেও দেখা যাচ্ছে বাড়তি চাপ। আমদানি করা রসুন ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং দেশি রসুন ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তেজপাতার দাম উঠেছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা কেজিতে। এক বছর আগে তেজপাতা বিক্রি হয়েছে ২০০ থেকে ২২৫ টাকায়।সবজির বাজারেও স্বস্তি সীমিত। কাঁচা মরিচ ১২০ থেকে ১৬০ টাকা বেগুন ৯০ থেকে ১২০ টাকা এবং শসা ৫০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে গত বছরের তুলনায় কাঁচা মরিচের দাম কমেছে। তখন কেজিপ্রতি দাম ছিল ১৮০ থেকে ২২০ টাকা।চাল ও ডালের বাজার অবশ্য তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। সরু চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকা মাঝারি চাল ৫৫ থেকে ৬৫ টাকা এবং মোটা চাল ৫০ থেকে ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মসুর ডালের দাম মানভেদে ৯৫ থেকে ১৬০ টাকা।আড়ও পড়ুন,জিটুজি ব্যবস্থায় ইউরিয়া সার আমদানির দুই প্রস্তাব অনুমোদনতবে পরিবারের মাসিক বাজার শুধু চাল ডালে সীমাবদ্ধ নয়। মাছ মাংস ডিম দুধসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যোগ হওয়ায় সামগ্রিক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।বর্তমানে রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি। গরুর মাংস ৭৮০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকার বেশি। ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬০০ থেকে ৭৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা হালি। বিক্রেতাদের দাবি, পাইকারি বাজারে বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে বলেই খুচরা বাজারে দাম বাড়ছে। তাদের ভাষ্য, অতিরিক্ত লাভের জন্য ইচ্ছামতো দাম বাড়ানো হচ্ছে না।

বাজারের ব্যাগে পণ্য কমছে খরচ বাড়ছেই