দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের নতুন কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে গ্যাস। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ থেকে আগামীকাল শনিবার জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।কূপটির উদ্বোধনের পরপরই জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এতে আমদানি করা গ্যাসের ওপর নির্ভরতার চাপ কিছুটা কমিয়ে দেশীয় উৎস থেকে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তারা।বিজিএফসিএলের কর্মকর্তারা জানান, তিতাসের ২৮ ২৯ ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপ এবং বাখরাবাদ ১১ নম্বর কূপের কাজ এগিয়ে চলছে। এসব কূপের কার্যক্রম শেষ হলে আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।তিতাস ২৮ নম্বর কূপের খননকাজ প্রায় এক মাস আগে শেষ হয়েছে। কূপটির গভীরতা প্রায় ১৩ হাজার ফুট। প্রায় ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিতাস ২৮ ২৯ ৩০ ও কামতা ২ নম্বর কূপ খননের কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে তিতাস ২৮ নম্বর কূপই শনিবার উৎপাদনে যাচ্ছে।এদিকে তিতাস ২৯ নম্বর কূপের মূল খননকাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে লগিংসহ আনুষঙ্গিক কার্যক্রম চলছে। আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে কূপটি উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। এই কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।তিতাস ৩০ নম্বর কূপের কাজও আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। আড়ও পড়ুন,খেলাপি ঋণ আদায় ও ক্যাশলেস লেনদেন বাড়াতে রূপালী ব্যাংকের জোরসেখান থেকেও দৈনিক ১০ থেকে ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।অন্যদিকে তিতাস ৩১ নম্বর গভীর অনুসন্ধান কূপের খননকাজ শুরু হয়েছে চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল। ইতোমধ্যে কূপটির খনন গভীরতা প্রায় চার হাজার ৯২০ মিটারে পৌঁছেছে। লক্ষ্যমাত্রা গভীরতা পাঁচ হাজার ৬০০ মিটার। ভূতাত্ত্বিক জটিলতা না থাকলে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে কাজ শেষ হতে পারে। সফল হলে এই কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।তিতাস ৩১ একটি অনুসন্ধানমূলক কূপ হওয়ায় এখানে নতুন গ্যাসের মজুদ আবিষ্কারের সম্ভাবনাও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী প্রায় দুই টিসিএফ অতিরিক্ত মজুদ পাওয়া যেতে পারে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ মজুদের পরিমাণ নিশ্চিত নয়।সব মিলিয়ে তিতাস ২৮ ২৯ ৩০ ও ৩১ নম্বর কূপ এবং বাখরাবাদ ১১ নম্বর কূপ থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৬৭ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের নিটওয়্যার পোশাক শিল্প। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সংকটের কারণে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ প্রায় ৫৫ শতাংশ নিটওয়্যার কারখানার রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে অথবা কমে গেছে।মঙ্গলবার পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বিকেএমইএর এক জরিপ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য।প্রতিবেদনে বলা হয়েছে গত ২০ জুলাই থেকে শুরু হওয়া গ্যাস সংকট এবং পরবর্তীতে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের নিটওয়্যার পোশাক রপ্তানিকারকদের ৮৭ শতাংশ সময়মতো শিপমেন্ট করতে পারেননি। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সরবরাহকারীকে ছাড় দিতে হয়েছে।বিকেএমইএর সক্রিয় সদস্য প্রায় ৮০০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ১৬০টি কারখানার তথ্যের ভিত্তিতে জরিপ প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭৫ শতাংশ গ্যাস সংকটে এবং ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে।আড়ও পড়ুন,শিল্পাঞ্চলে বাড়ছে গ্যাসের চাপএকই সময়ে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় গ্যাসের চাপ প্রায় ৭৮ শতাংশ কম ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়েছে প্রায় ৯২ শতাংশ কারখানাকে। এতে বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়। একই সঙ্গে প্রায় ৯২ শতাংশ কারখানায় শ্রমঘণ্টার অপচয় হয়েছে।সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা নিয়ে। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৯ শতাংশ কারখানা মালিক জানিয়েছেন তারা বিদেশি ক্রেতার আস্থা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন।এদিকে তিন-চতুর্থাংশের বেশি কারখানা মালিক জানিয়েছেন জ্বালানি সংকটের কারণে তাদের উৎপাদন আংশিকভাবে বন্ধ হয়েছে। ঋণখেলাপির ঝুঁকিতে পড়েছেন প্রতি দশজনের ছয়জন। আর ৭ শতাংশ কারখানা মালিক জানিয়েছেন তাদের কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি আদেশ আরও কমতে পারে। এতে দেশের নিটওয়্যার শিল্পে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে। দেশীয় উৎসের গ্যাসের পাশাপাশি আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি সরবরাহ বাড়ানোর ফলে গ্যাস পরিস্থিতিতে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা দিয়েছে।মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় জাতীয় গ্রিডে মোট ২৬০ দশমিক ৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। পেট্রোবাংলার পরিচালক অপারেশনস অ্যান্ড মাইনস প্রকৌশলী মো. শোয়েব এ তথ্য জানিয়েছেন।পেট্রোবাংলা বলছে, জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের প্রাপ্যতা বাড়াতে দেশীয় উৎসের উৎপাদন এবং আমদানিকৃত এলএনজি সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় করা হচ্ছে।মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় সরবরাহ করা মোট গ্যাসের মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে ১৬১ দশমিক ৫ কোটি ঘনফুট। আর এলএনজি থেকে সরবরাহ হয়েছে ৯৯ দশমিক ১ কোটি ঘনফুট।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে উৎপাদন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে। আড়ও পড়ুন,‘মারো না কেন, মারো’—সাদ্দামকে ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশ: চিফ প্রসিকিউটরএর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন শিল্প সার উৎপাদনসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে গ্যাস সরবরাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার আশা করা হচ্ছে।পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে সোমবার জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছিল ২৩৪ দশমিক ৫৩ কোটি ঘনফুট। আর রবিবার সরবরাহ ছিল ২৩৩ দশমিক ১৯ কোটি ঘনফুট।মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় সরবরাহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬০ দশমিক ৬ কোটি ঘনফুটে। অর্থাৎ একদিনের ব্যবধানে সরবরাহ বেড়েছে ২৬ দশমিক ০৭ কোটি ঘনফুট। আর রবিবারের তুলনায় বেড়েছে ২৭ দশমিক ৪১ কোটি ঘনফুট।মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহে এই উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি জ্বালানি পরিস্থিতিতে স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে চাহিদার তুলনায় এখনও ঘাটতি থাকায় সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি এলএনজি সরবরাহ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে পেট্রোবাংলা।
শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। জাতীয় গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইনে সরবরাহ বাড়ানোর পর ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হয়েছে। অন্যান্য শিল্পাঞ্চলেও ধীরে ধীরে সরবরাহ বাড়ছে।ব্যবসায়ী নেতারা আশা করছেন আজ রাত থেকে আগামীকালের মধ্যে দেশের অধিকাংশ শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ আরও বাড়বে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক জানিয়েছেন জাতীয় সঞ্চালন পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দীর্ঘ সময় কম চাপ থাকার কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাজার হাজার গ্রাহকের কাছে স্বাভাবিক চাপে গ্যাস পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগবে বলেও জানান তিনি।পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে আজ বিকেল ৪টায় জাতীয় গ্রিডে ২৬০ দশমিক ৬ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। আড়ও পড়ুন,জ্বালানি চাহিদা মেটাতে অক্টোবরের মধ্যে আরও ছয় কার্গো এলএনজি কিনছে সরকারআগের দিন একই সময়ে সরবরাহের পরিমাণ ছিল ২৩৪ দশমিক ৫৩ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ একদিনের ব্যবধানে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক হয়েছে। তবে ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি পুরোপুরি জানতে আগামীকাল সকালে কারখানা মালিকদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হবে।ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী চট্টগ্রাম জোনে গ্যাস সরবরাহে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। তবে ঢাকা ময়মনসিংহ গাজীপুর মানিকগঞ্জ সাভার আশুলিয়া নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর মতো শিল্পাঞ্চলে এখনো কাঙ্ক্ষিত উন্নতি দেখা যায়নি।গাজীপুরের কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ এখনো বাড়েনি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন। তবে আগামীকালের মধ্যে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে আশা করছেন তিনি।ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ আরও বাড়ানো গেলে রাত থেকে আগামীকালের মধ্যে দেশের অধিকাংশ শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরে আসতে পারে।
সহজ ও দ্রুত খবরের আপডেট পেতে আমাদের অ্যাপটি ইন্সটল করুন।