মায়ের গর্ভেই শিশুর টিউমার ধ্বংস করলেন চীনের চিকিৎসকেরা
মায়ের গর্ভে থাকা শিশুর বুকের মারাত্মক টিউমার অস্ত্রোপচার ছাড়াই সংকুচিত করে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছেন চীনের একদল চিকিৎসক। আধুনিক মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাঁরা গর্ভস্থ শিশুর ফুসফুসের জন্মগত ত্রুটিজনিত টিউমার ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছেন। চিকিৎসকদের এ সাফল্য ভবিষ্যতে জটিল রোগে আক্রান্ত গর্ভস্থ শিশুদের চিকিৎসায় নতুন আশা জাগিয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এ রোগের নাম কনজেনিটাল পালমোনারি এয়ারওয়ে ম্যালফরমেশন বা সিপিএএম। এটি ফুসফুসের একটি জন্মগত ত্রুটি। চিকিৎসকদের মতে, প্রতি ২৫ থেকে ৩৫ হাজার গর্ভধারণের মধ্যে প্রায় একটিতে এ ধরনের সমস্যা দেখা যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ ত্রুটি গুরুতর হয়ে ওঠে না। তবে কোনো কোনো শিশুর ক্ষেত্রে টিউমার বা অস্বাভাবিক টিস্যু দ্রুত বড় হতে পারে। এতে গর্ভস্থ শিশুর হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। এমনকি শিশুর শরীরে অতিরিক্ত তরল জমে গর্ভেই মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সাধারণত এ রোগের চিকিৎসায় পরিস্থিতি অনুযায়ী স্টেরয়েডজাতীয় ওষুধ ব্যবহার করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে টিউমারের সিস্টে জমে থাকা তরল বের করে দিতে বিশেষ নল ব্যবহার করা হয়।আরও পড়ুন,পাকিস্তান সৌদি তুরস্কের দীর্ঘ সম্পর্কের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা চুক্তিগুরুতর পরিস্থিতিতে ‘ফিটাল লোবেক্টমি’ নামের জটিল অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। তবে এসব পদ্ধতির সঙ্গে বিভিন্ন ঝুঁকি জড়িত। সম্প্রতি চিকিৎসাবিজ্ঞান সাময়িকী আলট্রাসাউন্ড ইন অবস্টেট্রিকস অ্যান্ড গাইনোকোলজিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চীনের চিকিৎসকদের অভিনব চিকিৎসাপদ্ধতির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪০ বছর বয়সী এক নারীর গর্ভে থাকা শিশুর ২২ সপ্তাহের মাথায় টিউমারটি প্রায় পাঁচ সেন্টিমিটার বড় হয়ে যায়। টিউমারটি শিশুর হৃৎপিণ্ড ও ফুসফুসে চাপ সৃষ্টি করছিল। পাশাপাশি শিশুর পেটে বিপজ্জনক মাত্রায় তরল জমার লক্ষণও দেখা যায়। এ অবস্থায় চিকিৎসকেরা মায়ের পেটের ওপর দিয়ে একটি সরু সুই গর্ভস্থ শিশুর ফুসফুসের টিউমারে প্রবেশ করান। এরপর সুইয়ের মাধ্যমে মাইক্রোওয়েভ শক্তি প্রয়োগ করে টিউমারের অস্বাভাবিক কোষগুলো উত্তপ্ত ও ধ্বংস করা হয়। এ প্রযুক্তিতে টিউমারের ভেতরে তাপ তৈরি করে অস্বাভাবিক টিস্যু নষ্ট করা হয়। চিকিৎসার মাত্র তিন দিনের মধ্যেই টিউমারটি উল্লেখযোগ্যভাবে ছোট হয়ে আসে। একই সঙ্গে শিশুর পেটে জমে থাকা অতিরিক্ত তরলও পুরোপুরি দূর হয়ে যায়। ফলে গর্ভস্থ শিশুর শারীরিক অবস্থার উন্নতি ঘটে। পরবর্তী সময়ে গর্ভধারণের ৩৭তম সপ্তাহে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুটির জন্ম হয়। জন্মের সময় তার ওজন ছিল প্রায় দুই দশমিক নয় কেজি। চিকিৎসকেরা এ পদ্ধতিকে গর্ভস্থ শিশুর সিপিএএম চিকিৎসায় মাইক্রোওয়েভ অ্যাবলেশনের প্রথম সফল প্রয়োগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রচলিত বড় অস্ত্রোপচারের তুলনায় এটি কম আক্রমণাত্মক পদ্ধতি হওয়ায় ভবিষ্যতে এর ব্যবহার নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, একটি মাত্র ঘটনার ফলাফলের ভিত্তিতে এ চিকিৎসাপদ্ধতির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। আরও গবেষণা ও একাধিক রোগীর ক্ষেত্রে প্রয়োগের মাধ্যমে এর ফলাফল যাচাই করতে হবে। ভবিষ্যতে এ পদ্ধতি নিরাপদ, কার্যকর ও পুনরায় প্রয়োগযোগ্য প্রমাণিত হলে গর্ভস্থ শিশুর জটিল টিউমার চিকিৎসায় এটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি কমিয়ে আরও অনেক শিশুর জীবন বাঁচানোর সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।