যুদ্ধ, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং এল নিনোর প্রভাবে খরার আশঙ্কা সব মিলিয়ে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আগামী কয়েক মাসে এই চাপ তীব্র হতে পারে। এমনকি এর প্রভাব পুরো ২০২৭ সালজুড়েও থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বেন নিম্ন আয়ের মানুষ। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার ৬৩ বছর বয়সী পার্কিংকর্মী মুহাম্মদ ইয়াসিনের জীবনে এর প্রভাব ইতোমধ্যে স্পষ্ট। আগে চাল, টেম্পে ও টোফু কিনতে যেখানে তাঁর খরচ হতো ৭ থেকে ৮ হাজার রুপিয়া, এখন একই খাবারের জন্য দিতে হচ্ছে ১৫ হাজার রুপিয়া। চার সন্তানের বাবা ইয়াসিনের সাপ্তাহিক আয় ২ লাখ থেকে ৩ লাখ রুপিয়া। ফলে সংসারের খরচ সামলাতে তাঁকে খাবারের পরিমাণ কমাতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধের কারণে গম পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। লোহিত সাগরে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে জাহাজকে দীর্ঘ পথ ঘুরে চলতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন,আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ল স্বর্ণের দাম
পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত জ্বালানি ও সার সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর সঙ্গে এল নিনোর প্রভাবে খরার আশঙ্কা যুক্ত হওয়ায় কৃষি উৎপাদন নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো জানিয়েছেন, এসব কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে পড়েছে। সংস্থাটির খাদ্যমূল্য সূচক গত সেপ্টেম্বরে ১৩৬ পয়েন্টে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ। চলতি বছর আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এশিয়ার প্রধান চাল রপ্তানিকারক দেশগুলোতে চালের দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। ইন্দোনেশিয়ায় ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে রান্নার তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। যুদ্ধের ঝুঁকি ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নৌপথে পণ্য পরিবহনের ভাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে। এতে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর খাদ্য সংগ্রহের খরচ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক মাসে বিভিন্ন দেশ আবার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে খাদ্যশস্য আমদানি বাড়ালে চাহিদার ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। সয়াবিন ও ভুট্টার মজুত আপাতত পর্যাপ্ত থাকলেও ভবিষ্যৎ সরবরাহ নির্ভর করবে প্রধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর ফলনের ওপর। সব মিলিয়ে, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকলে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা আরও কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে পরিস্থিতি আরও সংকটপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা আগামী দিনগুলোতে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মতামত