হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া এবং দীর্ঘদিন জমাট থাকা মাটি ও বরফের স্তর বা পারমাফ্রস্ট নরম হয়ে পড়ায় বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। গবেষকদের আশঙ্কা, এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশসহ হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের আট দেশের বিস্তীর্ণ জনপদে।বাংলাদেশ ছাড়াও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে ভারত পাকিস্তান নেপাল ভুটান চীন আফগানিস্তান ও মিয়ানমার। হিমবাহের পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পাহাড়ি এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। পশ্চিমে আফগানিস্তান থেকে পূর্বে মিয়ানমার পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত উজান ও ভাটি অঞ্চলেও এর প্রভাব পড়তে পারে।গবেষকদের মতে, হিমবাহ গলে যাওয়ার পাশাপাশি পারমাফ্রস্ট নরম হয়ে পাহাড়ের ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। এতে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে হিমবাহের পানি জমে তৈরি হওয়া হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে আকস্মিক বন্যা বা হিমবাহ হ্রদভাঙা বন্যা দেখা দিতে পারে।হিমালয় থেকে এশিয়ার ১০টি প্রধান নদী ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিন্ধু গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র ইরাবতী সালউইন মেকং ইয়াংসি হলুদ নদীসহ গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো। এসব নদীর অববাহিকায় প্রায় ২০০ কোটি মানুষের বসবাস। তাদের পানীয় জল কৃষি জীবিকা ও অর্থনীতির সঙ্গে এসব নদীর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।বাংলাদেশের জন্য গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গঙ্গা ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর পদ্মা নামে প্রবাহিত হয়েছে। আর তিব্বতে উৎপন্ন ব্রহ্মপুত্র চীন ও ভারতের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে এসে যমুনা নামে প্রবাহিত হয়েছে।আইসিআইএমওডির তথ্য অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় প্রায় ১১ কোটি ৪০ লাখ মানুষের বসবাস।
আড়ও পড়ুন,নতুন বেতন স্কেলে যেসব সরকারি কর্মচারী সুবিধা পাবেন না
এর মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ বাংলাদেশে। ফলে হিমালয়ের পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের পানি কৃষি ও নদীকেন্দ্রিক জনজীবনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।সিস্টেমিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ভারতের অংশেই প্রায় ২০০টি হিমবাহ হ্রদ বাঁধ ভেঙে যাওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ৫৬টি অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিবেদনের প্রধান লেখক অরুশি চোপড়া বলেছেন, হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা আবার ঘটবে কি না তার চেয়ে কখন ঘটবে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।আইসিআইএমওডির ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ২০১০ থেকে ২০১৯ সময়ে হিমবাহ গলার হার আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। স্যাটেলাইট তথ্য রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন সেন্সরের মাধ্যমে হিমবাহ ও হিমবাহ হ্রদের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।একই সঙ্গে হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং সীমান্ত পেরিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন গবেষকরা। কারণ হিমালয় থেকে নেমে আসা পানি কোনো সীমান্ত মানে না। উজানে ঘটে যাওয়া কোনো বিপর্যয়ের প্রভাব তাই কয়েকটি দেশের সীমানা পেরিয়ে ভাটির জনপদেও পৌঁছাতে পারে।
মতামত